মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার নতুন মাত্রা যোগ করলেও এশিয়া-প্যাসিফিক (এপ্যাক) অঞ্চলের বিমা খাত এখনো দৃঢ়তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরাসরি যুদ্ধজনিত ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের অস্থিরতাই এ অঞ্চলের বিমা শিল্পের জন্য প্রধান ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, “এশিয়া-প্যাসিফিক ইনস্যুরারস: মার্কেট ভোলাটিলিটি ইজ দ্য লার্জেস্ট ওয়ার-রিলেটেড ইমপ্যাক্ট” শীর্ষক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তা কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর প্রভাব বিস্তৃত হবে বৈশ্বিক বাণিজ্য, পরিবহন এবং উৎপাদন খাতেও।
হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ, সেখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তার প্রতিক্রিয়া দ্রুত বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ চেইনে চাপ তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত বিমা কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।
এসঅ্যান্ডপি’র পূর্বাভাস অনুযায়ী, সংঘাতের তীব্রতা এপ্রিলের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরবর্তীতে ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলো আবার সচল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও কিছু অর্থনৈতিক প্রভাব কয়েক মাস ধরে অব্যাহত থাকতে পারে, তবুও বিমা কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী মূলধনী ভিত্তি (ক্যাপিটাল বাফার) তাদের এ ধরনের চাপ সামাল দিতে সহায়তা করবে।
তবে সরাসরি ঝুঁকির ক্ষেত্র পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। বিশেষত সামুদ্রিক ও কার্গো বিমা খাতে সীমিত আকারে দাবি বৃদ্ধি পেতে পারে, কারণ মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক রুটগুলোতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। যদিও এ খাত মোট প্রিমিয়ামের একটি ছোট অংশ, তবুও আঞ্চলিকভাবে এর প্রভাব কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হতে পারে।
অন্যদিকে, বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রভাব বিমা খাতের জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়ানোর দিকে ধাবিত করছে। এর ফলে বিমা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে এবং একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের ক্রেডিট বিশ্লেষক ফিলিপ চুং-এর মতে, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বিমা কোম্পানিগুলোর ইনপুট খরচ আরও বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়বে। এর ফলে নন-লাইফ বিমা খাতে—বিশেষ করে মোটর, সম্পত্তি ও বাণিজ্যিক বিমায়—দাবির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর প্রিমিয়াম বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিফলিত হতে পারে।
নিম্নে সম্ভাব্য প্রভাবগুলোর একটি পরিমার্জিত সারণি তুলে ধরা হলো—
| প্রভাবের ক্ষেত্র | সম্ভাব্য পরিবর্তন | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|---|
| আর্থিক বাজার | অস্থিরতা বৃদ্ধি | বিনিয়োগ ঝুঁকি ও আয়ের অনিশ্চয়তা |
| জ্বালানি মূল্য | ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি | মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি |
| সুদের হার | ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা | ঋণগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধি |
| সামুদ্রিক ও কার্গো বিমা | সীমিত দাবি বৃদ্ধি | নির্দিষ্ট খাতে ক্ষতির সম্ভাবনা |
| নন-লাইফ বিমা | ব্যয় বৃদ্ধি | প্রিমিয়াম বাড়ার সম্ভাবনা |
| নিম্ন-আয়ের দেশ | অধিক ঝুঁকি | অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় চাপ |
প্রতিবেদনটি আরও সতর্ক করেছে যে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে জ্বালানি আমদানিনির্ভর নিম্ন-আয়ের অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এসব দেশের বিমা কোম্পানিগুলো দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যয়, কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিমা খাত বর্তমানে স্থিতিশীল থাকলেও এর ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপ্রকৃতির ওপর। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এই খাত তার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে; তবে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে ঝুঁকির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
