ভারত সরকার দেশের নৌবাণিজ্য খাতকে আরও শক্তিশালী ও ঝুঁকিমুক্ত করতে ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১২৯.৮ বিলিয়ন রুপি) সমপরিমাণ সার্বভৌম গ্যারান্টি-সমর্থিত একটি সামুদ্রিক বিমা তহবিল গঠনের অনুমোদন দিয়েছে। ‘ভারত মেরিটাইম ইনসুরেন্স পুল’ নামে এই উদ্যোগটি কেবল একটি আর্থিক কাঠামো নয়, বরং এটি ভারতের সামুদ্রিক খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৈশ্বিক বিমা বাজারের অস্থিরতা, প্রিমিয়ামের ওঠানামা এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিমা পুলের মাধ্যমে জাহাজের কাঠামো ও যন্ত্রপাতি (Hull & Machinery), পণ্য পরিবহন (Cargo), তৃতীয় পক্ষের দায়বদ্ধতা (Protection & Indemnity – P&I) এবং যুদ্ধ ও সংঘাতজনিত ঝুঁকি (War Risk) কভার করা হবে। ফলে ভারতীয় পতাকাবাহী ও নিয়ন্ত্রিত জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক জলপথে, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে, আরও সুরক্ষিতভাবে চলাচল করতে পারবে। এর ফলে শিপিং কোম্পানিগুলোর অপারেশনাল ঝুঁকি কমবে এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।
ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ বিষয়ক মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এই উদ্যোগকে দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি “গেম-চেঞ্জার” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, বিদেশি বিমা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতার কারণে ভারতীয় শিপিং খাত দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মুখে ছিল। আন্তর্জাতিক সংঘাত বা উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে অনেক সময় বিমা প্রিমিয়াম বেড়ে যায় বা কভারেজ সীমিত হয়ে পড়ে, যা সরাসরি বাণিজ্য ব্যয়ে প্রভাব ফেলে।
ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় এই পদক্ষেপ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। দেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ (পরিমাণের হিসেবে) এবং প্রায় ৯৫ শতাংশ (মূল্যমানের হিসেবে) সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। এত বিশাল পরিসরের বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য স্থিতিশীল বিমা কাঠামো অপরিহার্য। অথচ এতদিন এই খাতটি মূলত বিদেশি আন্ডাররাইটারদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা একটি কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগর, হরমুজ প্রণালী এবং ওমান উপসাগর অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং রুটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব সরাসরি বিমা খাতে পড়েছে—অনেক ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে বিমা কভারেজই সীমিত বা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ভারতীয় শিপিং কোম্পানিগুলোর খরচ বেড়েছে এবং বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ভারত মেরিটাইম ইনসুরেন্স পুল’ একটি টেকসই সমাধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। এটি কেবল বিমা সুবিধা প্রদান করবে না, বরং সংকটকালেও ধারাবাহিক কভারেজ নিশ্চিত করবে। জাহাজের শারীরিক ক্ষতি, পণ্য পরিবহনের ঝুঁকি, ক্রুদের নিরাপত্তা, পরিবেশগত ক্ষতি এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিচালনাজনিত ঝুঁকি—সবই এর আওতায় থাকবে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, ভারতীয় জাহাজগুলো বিমা সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না।
এছাড়া, এই উদ্যোগ ‘মেরিটাইম ইন্ডিয়া ভিশন ২০৩০’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার লক্ষ্য দেশের সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর আধুনিকায়ন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করা।
নিচে এই উদ্যোগের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| প্রকল্পের নাম | ভারত মেরিটাইম ইনসুরেন্স পুল |
| মোট গ্যারান্টি | ১.৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১২৯.৮ বিলিয়ন রুপি) |
| কভারেজ | Hull & Machinery, Cargo, P&I, War Risk |
| উপকারভোগী | ভারতীয় পতাকাবাহী ও নিয়ন্ত্রিত জাহাজ |
| প্রধান লক্ষ্য | বিদেশি বিমা নির্ভরতা কমানো |
| প্রেক্ষাপট | বৈশ্বিক উত্তেজনা ও প্রিমিয়াম বৃদ্ধি |
সার্বিকভাবে, এই উদ্যোগ ভারতের সামুদ্রিক খাতে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করবে না, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলবে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে, যেখানে নিজস্ব বিমা কাঠামোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব।
