বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য জলবায়ু বীমার আওতা দ্রুত সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘন ঘন দুর্যোগ ও ক্ষতির মুখে থাকা দরিদ্র পরিবারগুলো পর্যাপ্ত আর্থিক সুরক্ষা ছাড়া টিকে থাকতে পারছে না, ফলে এ খাতে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দরিদ্র পরিবারগুলোকে জলবায়ু ঝুঁকি থেকে রক্ষায় বীমার প্রিমিয়াম সরকারকেই বহন করা উচিত। একই সঙ্গে এ অর্থায়ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন থেকে আসা প্রয়োজন বলে তাঁরা মত দেন। তাঁদের দাবি, উন্নত দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।
এই বিষয়গুলো নিয়ে খুলনায় একটি হোটেলে আয়োজিত বিভাগীয় গোলটেবিল আলোচনায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। আয়োজন করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং এতে সহায়তা করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানে উপকূলীয় অঞ্চলে দরিদ্রবান্ধব, লিঙ্গ সংবেদনশীল ও মানবাধিকারভিত্তিক জলবায়ু ও দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন ও বীমা প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়।
আয়োজক সংস্থাটি ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যা বহুপক্ষীয় অংশীদারিত্বভিত্তিক জলবায়ু ও দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন ও বীমা উন্নয়নে কাজ করছে।
জলবায়ু অর্থায়ন ও বীমা নিয়ে মূল বক্তব্যসমূহ
অনুষ্ঠানে বক্তারা বৈশ্বিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি, অর্থায়ন ব্যবস্থার ঘাটতি এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ নিয়ে বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
| বক্তা | পদবী | মূল বক্তব্য |
|---|---|---|
| শামিম আরফিন | নির্বাহী পরিচালক, আয়োজক সংস্থা | উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া, জলবায়ু বীমায় সরকারের প্রিমিয়াম বহনের দাবি |
| নজরুল ইসলাম মনজু | প্রশাসক, খুলনা সিটি করপোরেশন | রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে জলবায়ু ইস্যুর অনুপস্থিতি |
| এস এম মনিরুল হাসান (বাবু) | প্রশাসক, জেলা পরিষদ | ফসল, পরিবার ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা |
| অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির | প্রধান নির্বাহী, সুন্দরবন একাডেমি | নীতিকে জনমুখী না করে লাভজনক করার কারণে সমাধান ব্যর্থ |
| অধ্যাপক শরিফ হাসান লিমন | খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় | জলবায়ু অর্থায়নে শক্তিশালী তথ্যভাণ্ডারের গুরুত্ব |
| অধ্যাপক ড. নাজিয়া হাসান | গবেষক | দীর্ঘমেয়াদি ও গবেষণাভিত্তিক মহাপরিকল্পনার প্রয়োজন |
| মো. নজরুল ইসলাম | কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর | উপকূলে ফসল বৈচিত্র্যকরণে চ্যালেঞ্জ ও সহায়তার প্রয়োজন |
| বিশ্বজিৎ কর | সহকারী মহাব্যবস্থাপক, বীমা প্রতিষ্ঠান | জলবায়ু বীমাকে ক্ষতি হ্রাসের কার্যকর উপায় হিসেবে উল্লেখ |
| আশিক ই এলাহী | এনজিও প্রতিনিধি | বীমা ব্যবস্থায় দুর্নীতির কারণে আস্থাহীনতা |
| হিমাদ্রি শেখর মন্ডল | প্রযুক্তিগত সমন্বয়কারী | জলবায়ু অর্থায়নের জটিল ও পরিবর্তনশীল কাঠামো |
বক্তারা আরও বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় যেমন বোন জলবায়ু সম্মেলন এবং আসন্ন কনফারেন্সসমূহে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। শামিম আরফিন উল্লেখ করেন, ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিশ্রুতি থাকলেও নির্গমন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ, যা উদ্বেগজনক।
অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়, জলবায়ু বীমা ব্যবস্থা সহজ ও ব্যবহারবান্ধব হওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরাসরি উপকৃত হতে পারে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণ, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সবশেষে বক্তারা একমত হন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বীমা এখন একটি অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে, যা সঠিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
