অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থান খাতে গত ১২ মাসে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। এই সময়ের মধ্যে বহু পেশাজীবী ও চাকরিজীবী পদোন্নতি এবং বেতন বৃদ্ধির সুবিধা লাভ করেছেন। তবে এই আর্থিক উন্নতি অনেক করদাতার জন্য একটি নতুন এবং ভিন্নধর্মী আর্থিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান ও গবেষণামূলক তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরে যে সমস্ত চাকরিজীবীর বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই (৩৩.৩৩%) সরকারের নির্ধারিত ‘মেডিকেয়ার লেভি সারচার্জ’ বা এমএলএস (MLS)-এর আয়ের সীমা অতিক্রম করেছেন। এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত করের বড় আর্থিক বোঝা এড়াতে আগামী ১ জুলাই নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার পূর্বেই তাদের জন্য উপযুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল বীমা বা প্রাইভেট হসপিটাল ইন্স্যুরেন্স গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। অন্যথায় তাদের আয়ের একটি বড় অংশ অতিরিক্ত কর হিসেবে সরকারি তহবিলে চলে যাবে।
Table of Contents
বর্তমান কর ব্যবস্থা ও আয়ের নির্ধারিত সীমা
অস্ট্রেলীয় কর ব্যবস্থার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, করদাতাদের পারিবারিক ও বৈবাহিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই আয়ের বিশেষ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অবিবাহিত বা সিঙ্গেল ব্যক্তি: সিঙ্গেল ব্যক্তিদের জন্য বার্ষিক আয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭২,৭২১ মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ১০১,০০১ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের সমতুল্য।
দম্পতি ও পরিবার: দম্পতি এবং পারিবারিক করদাতাদের ক্ষেত্রে এই আয়ের বার্ষিক সীমার পরিমাণ হচ্ছে ১৪৫,৪৪১ মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ২০২,০০১ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।
কোনো করদাতার বার্ষিক আয় এই নির্দিষ্ট সীমা বা কোটা পার হওয়ার সাথে সাথেই কর বিভাগের এই বিশেষ নিয়মটি তার ওপর কার্যকর হতে শুরু করে।
অতিরিক্ত করের আর্থিক বোঝা ও আইনি নিয়মনীতি
‘মানি ডট কম ডট এইউ’ (Money.com.au) নামক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় অস্ট্রেলিয়ার এই কর সংক্রান্ত জটিলতার সুনির্দিষ্ট চিত্রটি উঠে এসেছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: যেসব করদাতা সরকারের নির্ধারিত আয়ের সীমা অতিক্রম করেছেন, কিন্তু সম্পূর্ণ অর্থবছরের জন্য কোনো উপযুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল বীমার আওতায় ছিলেন না, তাদের আয়ের ওপর অতিরিক্ত ১% থেকে ১.৫% পর্যন্ত সারচার্জ আরোপিত হতে পারে। এই বিশেষ সারচার্জটি অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ ২% মেডিকেয়ার লেভির অতিরিক্ত একটি কর হিসেবে চূড়ান্তভাবে গণ্য হবে।
এই অতিরিক্ত কর বা সারচার্জের সর্বনিম্ন আর্থিক পরিমাপ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| করদাতার শ্রেণী | সারচার্জের পরিমাণ (মার্কিন ডলার) | সারচার্জের পরিমাণ (অস্ট্রেলিয়ান ডলার) |
| অবিবাহিত বা সিঙ্গেল ব্যক্তি | $৭২৭ মার্কিন ডলার | $১,০১০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার |
| দম্পতি বা পরিবার | $১,৪৫৪ মার্কিন ডলার | $২,০২০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার |
এই অতিরিক্ত করের আওতা থেকে আইনিভাবে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য গ্রাহকদের অবশ্যই সরকারের নিবন্ধিত একটি স্বাস্থ্য তহবিলের অধীনে সম্পূর্ণ অর্থবছরের জন্য উপযুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল বীমা পলিসি সচল রাখতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বিশেষ আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে। কেবল অতিরিক্ত সেবা বা ‘এক্সট্রাস-অনলি’ (Extras-only) এবং কেবল অ্যাম্বুলেন্স সেবা বা ‘অ্যাম্বুলেন্স-অনলি’ (Ambulance-only) সংক্রান্ত স্বাস্থ্য পলিসিগুলো এই সারচার্জ বা অতিরিক্ত কর থেকে অব্যাহতির জন্য কোনোভাবেই যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। করদাতাকে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল বীমার আওতাভুক্ত হতে হবে।
নীতি নির্ধারণ ও বাজার যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় পরামর্শ
‘মানি ডট কম ডট এইউ’-এর স্বাস্থ্য বীমা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক ক্রিস হোয়াইটল সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে করদাতাদের উদ্দেশ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ প্রদান করেছেন। তিনি জানান, যেসব চাকরিজীবীর বার্ষিক আয় সম্প্রতি এই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে, তাদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজস্ব বেসরকারি হাসপাতাল বীমার বার্ষিক ব্যয় এবং সম্ভাব্য সারচার্জের আর্থিক পরিমাণের মধ্যে একটি তুলনামূলক মূল্যায়ন করা আবশ্যক।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বাজারে বর্তমানে অবিবাহিত ব্যক্তিদের জন্য কিছু মৌলিক বা বেসিক হাসপাতাল বীমা পলিসি বিদ্যমান রয়েছে, যার বার্ষিক খরচ প্রায় ৭২০ মার্কিন ডলার (স্থানীয় মুদ্রায় ১,০০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার) থেকে শুরু হয়। এই খরচটি বীমাহীন উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য সম্ভাব্য সারচার্জের বা অতিরিক্ত করের পরিমাণের তুলনায় অনেক কম। ফলে কর দেওয়ার চেয়ে বীমা গ্রহণ করা আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী। তবে ক্রিস হোয়াইটল একই সাথে উল্লেখ করেছেন যে, প্রাথমিক বা এন্ট্রি-লেভেলের এই বেসিক পলিসিগুলোতে স্বাস্থ্য সুবিধার পরিমাণ এবং পরিধি বেশ সীমিত থাকে। ফলস্বরূপ, দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে ভোক্তারা ডেন্টাল (দাঁতের চিকিৎসা), অপটিক্যাল (চোখের চিকিৎসা) এবং ফিজিওথেরাপি সেবার মতো বিস্তৃত এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা সম্বলিত উন্নত পলিসিগুলো বেছে নেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে পারেন।
ভবিষ্যৎ সীমার পরিবর্তন ও প্রজন্মের ভিত্তিতে প্রভাবের তারতম্য
অস্ট্রেলিয়ার কর প্রশাসন আগামী নতুন অর্থবছর থেকে এই নিয়মে কিছু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে এই মেডিকেয়ার লেভি সারচার্জের (এমএলএস) আয়ের সর্বনিম্ন সীমা আরও কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়েছে।
নতুন নিয়মে সিঙ্গেল ব্যক্তি: অবিবাহিত ব্যক্তিদের জন্য আয়ের এই সীমা বৃদ্ধি পেয়ে ৭৫,৬০১ মার্কিন ডলার বা ১০৫,০০১ অস্ট্রেলিয়ান ডলার নির্ধারিত হতে যাচ্ছে।
নতুন নিয়মে দম্পতি ও পরিবার: দম্পতি ও পারিবারিক করদাতাদের জন্য এই নতুন সীমার পরিমাণ হবে ১৫১,২০১ মার্কিন ডলার বা ২১০,০০১ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।
পরিচালিত গবেষণায় আরও একটি সামাজিক ও জনমিতিক চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে দেখা গেছে যে আয়ের সীমা অতিক্রমের এই প্রবণতায় তরুণ প্রজন্মের অস্ট্রেলিয়ানরা সবচেয়ে বেশি হারে প্রভাবিত বা আর্থিক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিগত এক বছরে কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন প্রজন্মের ওপর প্রভাবের হার নিচে উল্লেখ করা হলো:
মিলেনিয়াল প্রজন্ম: এই প্রজন্মের প্রায় ৪৯% উত্তরদাতা আয়ের সীমার ওপরে চলে গেছেন।
জেন জি প্রজন্ম: এই তরুণ প্রজন্মের ৩৯% উত্তরদাতা আয়ের সীমা অতিক্রম করে করের ঝুঁকিতে পড়েছেন।
জেন এক্স প্রজন্ম: তুলনামূলক প্রবীণদের মধ্যে এই প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৭%।
বেবি বুমার্স প্রজন্ম: সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এই প্রজন্মের মাত্র ৭% ব্যক্তি এই আয়ের ঊর্ধ্বমুখী সীমা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, কর্মক্ষেত্রে তরুণদের দ্রুত পদোন্নতি ও আয় বৃদ্ধি তাদের এই নতুন কর কাঠামোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
