কার্বন সনদ ও সবুজ বীমায় বড় সম্ভাবনা বাংলাদেশের

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে যে পরিবর্তন ঘটছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে নতুন একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস সনদ এবং সবুজ বীমা খাত কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে দেশটি বছরে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হতে পারে।

কার্বন নিঃসরণ হ্রাস সনদ থেকে আয়

কার্বন নিঃসরণ হ্রাস সনদ হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যেখানে এক টন কার্বন নিঃসরণ কমালে একটি সনদ অর্জিত হয়। এই সনদ বৈশ্বিক বাজারে বিক্রি করে আয় করা যায়। উন্নত দেশ ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নির্গমন সীমা পূরণের জন্য এসব সনদ ক্রয় করে থাকে।

বাংলাদেশ এই খাতে প্রথম উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয় ২০০৬ সালে, অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেডের উদ্যোগে। এরপর থেকে দেশটি প্রায় ২৫ লক্ষ ৩০ হাজার কার্বন সনদ বিক্রি করে প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ মার্কিন ডলার আয় করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্জন দেশের প্রকৃত সম্ভাবনার তুলনায় অত্যন্ত সীমিত।

বিশ্বব্যাপী এই সনদের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার কয়েক লক্ষ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে।

পরিবেশবান্ধব শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশে বর্তমানে ২৮০টিরও বেশি পরিবেশবান্ধব সনদপ্রাপ্ত কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো সর্বোচ্চ মানের সনদ অর্জন করেছে।

বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি পরিবেশবান্ধব কারখানার মধ্যে ৬৯টি বাংলাদেশে অবস্থিত, যা দেশের শিল্পখাতের সক্ষমতা ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

সবুজ বীমার প্রয়োজনীয়তা

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ঝুঁকি কমাতে সবুজ বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যন্ত্রপাতি ত্রুটি এবং বাজার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়।

বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৩১৫ মেগাওয়াট, যার প্রায় ৭৭ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে আসে। ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণে প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এই বিনিয়োগ নিরাপদ রাখতে কার্যকর বীমা ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পরিবেশগত শুল্ক নীতি ও রপ্তানি ঝুঁকি

২০২৬ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে একটি নতুন পরিবেশগত শুল্ক ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হবে, যেখানে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক ইউরোপীয় বাজারে হওয়ায় এই নীতির প্রভাব দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ হবে। ফলে কম কার্বন নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তর এখন অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

প্রধান তথ্যের সারসংক্ষেপ

বিষয়বর্তমান অবস্থাভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
কার্বন সনদ আয়প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ মার্কিন ডলারবছরে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার
পরিবেশবান্ধব কারখানা২৮০টির বেশিআরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্ষমতা১৩১৫ মেগাওয়াটদ্রুত বৃদ্ধির প্রয়োজন
ইউরোপীয় শুল্ক নীতি২০২৬ থেকে কার্যকররপ্তানিতে বড় প্রভাব

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

এই খাতে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কার্বন নিবন্ধন ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। নীতিমালা ও আইনি কাঠামোও সম্পূর্ণভাবে বিকশিত নয়। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কার্বন মূল্যায়ন ও যাচাইয়ের সক্ষম প্রতিষ্ঠানও সীমিত।

সবুজ প্রকল্পের জন্য বীমা প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়নে প্রয়োজনীয় তথ্য ও দক্ষতার অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত নীতি গ্রহণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ এই নতুন অর্থনৈতিক খাতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।

Leave a Comment