প্রতিকল্প উত্তমর্ণের নীতি – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ” অধ্যায়ের একটি পাঠ। বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ:
[বলা বাহুল্য, আর্থিক ক্ষতির অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে রক্ষা ব্যবস্থা তথা সম্ভাব্য বা সৃষ্ট ক্ষতির বিরুদ্ধে প্রতিকার বা উপশম হিসেবে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ/প্রদানের জন্যে পারস্পরিক চুক্তিজাত যে ব্যবস্থা আজ সারা পৃথিবী ব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তায় প্রচলিত, তাকেই বীমা হিসেবে অভিহিত করা হয়। সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে যে, বীমাকৃত সম্পদ-সম্পত্তির কোন ক্ষতি হলে বীমাই হচ্ছে তা পূরণ করে দেয়ার উপায়। অর্থাৎ, বীমাগ্রহীতা কর্তৃক প্রদত্ত বীমা সেলামীর প্রতিদানে বীমাকৃত সম্পত্তির ক্ষতি বীমাকারী পূরণ করে দেন।
এই ক্ষতিপূরণ তথা বীমাদাবী আদায়ের পথে স্বাভাবিক কারণেই কালক্রমে কিছু জটিলতা ও সমস্যার উদ্ভব হতে থাকে। যেমনঃ – অধিক লাভের আশায় বীমাকৃত সম্পত্তির অভিসন্ধিমূলক ও ইচ্ছাকৃত ক্ষতিসাধন, মিথ্যার আশ্রয়গ্রহণ, অনুচিত পন্থায় লাভবান হওয়া বা মুনাফা করার সুযোগ গ্রহণ ইত্যাদি। ক্রমাগতভাবে উদ্ভূত এরূপ সমস্যা ও জটিলতাসমূহ দুরীকরণের উদ্দেশ্যে বীমা ব্যবস্থায় যেসব পন্থা তথা নীতি অবলম্বন করা হয়েছে স্থলাভিষিক্ততার নীতি (Principle of Subrogation) তার মধ্যে অন্যতম একটি ।]
ক্ষতি সংঘটিত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতাসমূহ সম্পাদন সাপেক্ষে বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতিপূরণ করে দেন। কোন কোন ক্ষেত্রে, বিষয়বস্তু সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেসব ক্ষেত্রে, অনেক সময়ই বীমাকারী পুরোপুরি ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেন সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা করে। পুরো ক্ষতিপূরণ করার পর যদি দুর্ঘটনা যা ক্ষতির স্থল থেকে অথবা ক্ষতির কারণ (যদি হয় তৃতীয় কোন পক্ষ, তাহলে) তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে যা কিছু প্রাপ্য বা উদ্ধারযোগ্য তার দাবীদার কো হবেন – এ সমস্যাটি এক সময় দেখা দেয়।
ক্ষতিপুরণ দেয়ার পরেও যদি এরূপ ক্ষেত্রে, ক্ষতি বা দুর্ঘটনার স্থল থেকে অথবা তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে প্রাপ্য গ্রহ করার ব্যাপারে বীমাগ্রহীতাকে বিরত না করা হয় বা সুযোগ প্রদান করা হয়, তাহলে হীমাগ্রহীতা লাভবান হওয়ার বা মুনাফা করার প্রবণতায় উদ্বুদ্ধ বা উৎসাহিত হতে পারেন। [দুএকটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টিকে আরও একটু স্পষ্টতর করা যায়ঃ—
প্রতিকল্প উত্তমর্ণের নীতি

উদাহরণ-১
একটি পণ্য বোঝাই জাহাজ ঝড় কবলিত হয়ে ডুবে যায়। এক্ষেত্রে ক্ষতিটি সামগ্রিক। এখন, বীমাকারী আপাদতঃ কোন বাড়তি ঝামেলা বা উদ্ধার প্রচেষ্টায় না গিয়ে, বীমাগ্রহীতা/বীমাগ্রহীতাদের সম্পূর্ণ বা সামগ্রিকভাবে ক্ষতিপূরণ করে দিতে পারেন এবং অতঃপর, বীমাকারী সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী জাহাজ ও জাহাজস্থিত সম্পদ-সম্পত্তি, থেকে যা কিছু উদ্ধার করা সম্ভব, উদ্ধার করে স্বীয় মালিকানা ও অধিকারে নিয়ে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে, যদি বীমাগ্রহীতাকে সুযোগ দেয়া হয় তাহলে বীমাগ্রহীতা স্বাভাবিকভাবেই যাবতীয় উদ্ধারযোগ্য সম্পদ-সম্পত্তি লাভের অনুচিত চেষ্টায় প্রবৃত্ত বা প্রবুদ্ধ হতে পারেন।
উদাহরণ-২
“সি কুইন” নামক একটি জাহাজের সাথে সংঘর্ষে ‘গোল্ডেন ফিস’ নামক একটি জাহাজ সম্পূর্ণ বিভ্রস্ত হয়ে যায় এবং ‘সি কুইন’ জাহাজের কাপ্তানের দোষেই সংঘর্ষটি হয়। এক্ষেত্রে, ‘গোল্ডেন ফিস’ জাহাজের বীমাকারী জাহাজের বীমাগ্রহীতাকে সামগ্রিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করার পরে, বিধ্বস্ত জাহাজের উদ্ধারযোগ্য বা অবশিষ্ট অংশ এবং তৃতীয় পক্ষ (সি কুইন’ মালিক) -এর কাছ থেকে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা তথা ক্ষতিপূরণ লাভের অধিকারী হবেন। উপরন্তু, ক্ষতিপূরণ প্রদানের পর বীমাকারী ‘গোল্ডেন ফিস’-এর মালিকের প্রতিকল্প উত্তমর্ণ (মালিক বা মহাজন) হিসেবে প্রাপ্য আদায়ের জন্যে ও “সি কুইন” – মালিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় গ্রহণ করতে বা মোকদ্দমা দায়ের করতে পারবেন।
উপরোক্ত উভয় ক্ষেত্রেই, কোন সুযোগ থাকলেই ক্ষতিপূরণ লাভের পরেও বীমাগ্রহীতা উদ্ধারযোগ্য বা আদায়যোগ্য সম্পদ-সম্পত্তি অথবা অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধাদি লাভের যে কোন প্রচেষ্টায় প্রবৃত্ত হতে পারেন।] এই অতিরিক্ত লাভের বা মুনাফা করার প্রচেষ্টা কার্যতঃ অন্যায় এবং আইনতঃ অগ্রহণযোগ্য। এরূপ প্রচেষ্টা বীমাচুক্তিকে বাজী চুক্তিতে পর্যবশিত করে। তাই, সংশ্লিষ্ট আইনে তা নিয়ন্ত্রণের বিধান রাখা হয়েছে এবং তদনুযায়ী স্থলাভিষিক্ততার নীতি ও রীতি প্রবর্তন করা হয়েছে।
এ নীতি অনুযায়ী বীমাকারী কর্তৃক বীমাগ্রহীতাকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের পরে যে সম্পত্তির মালিক ছিলেন বীমাগ্রহীতা, এখন তার উদ্ধারযোগ্য অংশের মালিকানায় অভিষিক্ত হবেন বীমাকারী এবং তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে প্রাপ্য যা কিছু তা লাভের প্রতিকল্প অধিকারী বা মালিক হবেন বীমাকারী। তাই, এ নীতিকে স্থলাভিষিক্ততা বা প্রতিকল্প উত্তমর্গের নীতি বা মতবাদ বলা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রন্থকার এ নীতি বা মতবাদ –এর সংজ্ঞা ও তাৎপর্য তুলে ধরতে গিয়ে যা বলেছেন, তার দুএকটি অথবা আংশিক নিম্নে সন্নিবেশিত হলো।] .
স্থলাভিষিক্ততার নীতির সংজ্ঞাদান প্রসঙ্গে ঘোষ ও আগরওয়ালা বলেছেন 1 The Principle of Subrogation lays down that after the insurer indemnifies the insured against a loss or dange, he becomes subrogated to all the rights and remedies which the insured has against a third party in respect of loss or damage so paid for ” অর্থাৎ স্থলাভিষিক্ততার নীতি বিধায়ন করে যে, কোন ক্ষতি বা ধ্বংসের বিরুদ্ধে বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করার পরে তিনি (বীমাকারী) ক্ষতি বা ধ্বংসের জন্যে তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে বীমাগ্রহীতার প্রাপ্য যাবতীয় অধিকার এবং সুবিধাদি লাভের জন্যে স্থানাপন্ন বা (মালিক অথবা অবিকল্প পাওনাদার বা উত্তমর্ণ হিসেবে অভিষিক্ত (Subrogated) হন।

এম. এন. মিশ্রের মতে – “The Doctrine of Subrogation refers to the rights of the insurer to stand in the place of the inşured. after settlement of a claim, in so far as the insured’s right of recovery from an alternative source is involved” – অর্থাৎ, স্থলাভিষিক্ততার বা প্রতিকল্প উত্তমর্শের মতবাদ (বা নীতি) বলতে বীমাদাবী মিটানোর পরে বিকল্প (তৃতীয়) কোন উৎস থেকে উদ্ধার (বা লাভ) করতে পারেন – এমন অধিকারের স্থলে বীমাকারীর প্রতিকল্প উত্তমর্শ হিসেবে দাঁড়াবার বা অভিষিক্ত অথবা স্থনাপন্ন হওয়ার অধিকারকে বুঝায়।
মোদ্দা কথা হলো এই যে, সম্পত্তির ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বা ক্ষতি সম্মানের ফলে সামগ্রিক ক্ষতি সাধিত হলে, বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপুরণ করে দেয়ার পরে ক্ষতির কুল বা বীমার বিষয় তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে যা কিছু উচ্চারযোগ্য বা প্রাপ্য তার মালিকানা বা অধিকার বীমাগ্রহীতার স্থলে বীমাকারীই লাভ করেন। আইনত বীমাগ্রহীতার হলে বীমাকারীর মালিকানায় বা প্রতিকল্প পাওনাদারের ভূমিকায় দাড়াবার বা অভিহিত হওয়ার অথবা স্থানাপন্ন হওয়ার এই যে অধিকার বা নীতি অথবা মতবাদ তাকেই বলা হয় প্রতিকল্প উত্তমর্ণের নীতি অথবা স্থলাভিষিক্তকরণের নীতি।
