আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বীমা ও বৃত্তি চুক্তির মধ্যে পার্থক্য যা জীবন বীমা অধ্যায়ের অর্ন্তভুক্ত।
বীমা ও বৃত্তি চুক্তির মধ্যে পার্থক্য

বীমাকারবারীগণ কারবারী কার্যক্রম পরিচালনা তথা বীমাপত্র বিক্রয় করতে গিয়ে মানুষের বহু-বিচিত্র জীবনধারা এবং মানুষের বিভিন্ন প্রকৃতি ও প্রয়োজনের সাথে পরিচিত হয়েছেন। তারই বিভিন্ন পর্যায়ে বীমাকারীগণ মানুষের জীবন ধারা, প্রকৃতি, পেশা ও প্রয়োজন ভেদে যেমন বিভিন্ন ধরনের বীমাপত্র চালু এছেন – তেমনি শিশু, কিশোর, যুবা, বয়স্ক ও বৃদ্ধ এবং নারী ও পুরুষ ভেদে বিভিন্ন শ্রেণী ও বয়ঃক্রমের মানুষের জন্যে চালু হয়েছে বিভিন্ন বীমাব্যবস্থা ও পত্রের। অভিজ্ঞতার আলোকে এরূপ পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষিতে যেমন শিশুর জন্যে উদ্ভব হয়েছে শিশুরক্ষা সীমার – তেমনি, বৃদ্ধের জন্যে উদ্ভব ঘটেছে বৃত্তি ব্যবস্থার।
এ কথার মধ্য দিয়েই সম্ভবতঃ এসব ব্যবস্থার মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে ইঙ্গিত অনুভূত হয়। তবে, একটি পত্র থেকে অন্যটির এবং একটি ব্যবস্থা থেকে অন্যটির ভিন্নতা থাকলেও এদের মধ্যে যে সম্পর্ক বা মিলও রয়েছে প্রচুর তাও ঠিক। কিন্তু, অন্যান্য সব জীবন বীমা ব্যবস্থা থেকে বৃত্তি ব্যবস্থার ভিন্নতা বা পার্থক্য যে অপেক্ষাকৃত অধিক, সে কথা বলাই বাহুল্য।
বৃত্তিচুক্তি বা ব্যবস্থার সাথে সাধারণভাবে অন্যান্য জীবন বীমা চুক্তি বা ব্যবস্থার যেসব পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় নিম্নে তা সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো :
১। কিস্তি প্রদানের ধরন (Mode of paying premium) : অন্যান্য জীবন বীমা চুক্তিতে সাধারণতঃ বারবার কিস্তি প্রদান করা হয়, কিন্তু, বৃত্তি চুক্তিতে সাধারণতঃ একবারই কিস্তি প্রদান করা হয়।
উল্লেখ্য যে — ইংরেজী Annuity শব্দটির আভিধানিক অর্থ বার্ষিক বৃত্তি। এ ব্যবস্থার প্রচলিত রীতিই হচ্ছে মূলতঃ বীমাকারী কর্তৃক বৃত্তিগ্রহীতাকে বার্ষিক বৃত্তি প্রদান করা। তবে, কালক্রমে তা ষাম্মাসিক, ত্রৈমাসিক ইত্যাদি বৃত্তি হিসেবেও প্রদত্ত হতে আরম্ভ করে।
২। বীমাদাবী ও বৃত্তি প্রদানের ধরন (Mode of paying claim and annulty) : অন্যান্য বীমা চুক্তিতে বীমাদাবীর অর্থ সাধারণতঃ একবারেই পরিশোধ করা হয়; পক্ষান্তরে, বৃত্তি চুক্তিতে সাধারণতঃ বারবার বৃত্তি প্রদান করা হয়।
৩। দ্রুত ও বিলম্বিত মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা (Protection against early and late death):অন্যান্য জীবন বীমাগুলির অধিকাংশই বিশেষতঃ আজীবন বীমাপত্র স্বল্পায়ু বা দ্রুত মৃত্যুর ঝুঁকির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে; পক্ষান্তরে, বৃত্তি ব্যবস্থা অত্যন্ত দীর্ঘায়ু হওয়া বা বিলম্বিত মৃত্যুর ঝুঁকির বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
৪। বীমাদাবী বা বৃত্তি প্রদানের সময় (Time for paying claim or annuity) : বৃত্তিগ্রহীতার মৃত্যুতেই সাধারনতঃ বৃত্তি প্রদান বন্ধ হয়ে যায়; কিন্তু, অধিকাংশ জীবন বীমা চুক্তিতে সাধারণতঃ বীমাগ্রহীতার মৃত্যুর পরেই বীমাদাবী পরিশোধ করা হয়।
৫। নিজের বা অন্যের জীবনের কল্যাণ (Benefit for own life or other’s life) : অন্যান্য জীবন বীমা চুক্তি সাধারণতঃ অন্যদের কল্যাণের জন্যে করা হয়, কিন্তু, বৃত্তি চুক্তি মূলতঃ বৃত্তিগ্রহীতার নিজের কল্যাণের জন্যেই করা হয়।
৬। মৃত্যু বা জীবিতের হার নির্ণয় করা (To determine the death or living rate) : বীমাচুক্তিতে কিস্তি নির্ধারণের জন্যে মৃত্যুহার বের করতে হয়, কিন্তু,বৃত্তি চুক্তিতে জীবিতের হার বের করতে হয়।
৭। কিস্তি বা বৃত্তি হিসেবকরণের ভিত্তি (Basis for Calculating premium or annuity) : বীমা চুক্তিতে মৃত্যুহারের বা সম্ভাবনার উপর কিস্তির পরিমান হিসেব করা হয়; কিন্তু, বৃত্তি চুক্তিতে জীবিতের হার তথা বেঁচে থাকার সম্ভাবনার উপর নির্ভর করে বৃত্তির হার নির্ধারিত হয়।
৮। তহবিল পুঞ্জীভবন (Accumulation of Fund) : জীবন বীমা চুক্তির পর থেকে ক্রমাগতভাবে প্রিমিয়াম প্রদানে তহবিল বাড়তে থাকে; কিন্তু, বৃত্তি চুক্তিতে বৃত্তি প্রদানের ফলে তহবিল ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেতে থাকে।

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে সহজেই অনুমেয় যে, বীমা চুক্তি ও বৃত্তি চুক্তি অনেক ব্যাপারেই ঠিক বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। এতদসত্ত্বেও জীবন-জীবিকার জন্যে এ দু’টি মিলেই যেন এক পূর্ণ কর্মকাণ্ড। কেননা, জীবন বীমা সাধারণতঃ যেখানে সেবা দান শেষ করে; বৃত্তি ব্যবস্থা সেখান থেকে সেবাদান শুরু করে মুহূর্ত পর্যন্ত।
