বীমা খাতে এআই বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা অব্যাহত

বীমা শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও এর পূর্ণ আর্থিক সুফল অর্জনে এখনো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থা (legacy systems), বিচ্ছিন্ন ডেটা কাঠামো এবং দুর্বল ডিজিটাল সংহতকরণ, যা এআই-এর কার্যকর ব্যবহারকে সীমিত করছে।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান Boston Consulting Group-এর মার্চ মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রপার্টি অ্যান্ড ক্যাজুয়ালটি (P&C) বীমা খাতে এআই বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে এই খাতে এআই বিনিয়োগ মোট আয়ের প্রায় ১.৯ শতাংশে পৌঁছাবে, যা আগের বছরের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। এই প্রবণতা বীমা শিল্পে প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরের গতি ত্বরান্বিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যেসব বীমা প্রতিষ্ঠান এআই প্রযুক্তিকে সীমিত কিছু কার্যক্রমে না রেখে পুরো ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় একীভূত করতে সক্ষম হবে, তারা উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং মোট লিখিত প্রিমিয়াম (Gross Written Premium) সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি। অর্থাৎ, এআই শুধু দক্ষতা বাড়াচ্ছে না, বরং সরাসরি আয় বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

বর্তমানে বীমা কোম্পানিগুলো এআই ব্যবহার করছে মূলত আন্ডাররাইটিং, দাবি প্রক্রিয়াকরণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জালিয়াতি শনাক্তকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে। এসব প্রযুক্তি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় করা, মূল্য নির্ধারণের নির্ভুলতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত জালিয়াতি শনাক্ত করতে সহায়তা করছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রয়োগ বিচ্ছিন্নভাবে সীমাবদ্ধ থাকায় সামগ্রিক ব্যবসায়িক প্রভাব প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি পৃথক জরিপে AM Best জানায়, প্রায় ৬০ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান মনে করে ২০২৭ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে এআই তাদের ব্যবসায়িক মডেল মৌলিকভাবে পরিবর্তন করবে। এই পূর্বাভাস বীমা খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।

এই প্রসঙ্গে এএম বেস্টের শিল্প গবেষণা বিশ্লেষক কাইটলিন পিয়াসেকি উল্লেখ করেন, পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থা এআই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা, কারণ এগুলো আধুনিক ডেটা সংহতকরণের জন্য উপযোগী নয়। একই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ডিরেক্টর শ্রীধর মান্যেম বলেন, ডেটা যদি বিচ্ছিন্ন বা দুর্বলভাবে পরিচালিত হয়, তবে এআই-এর ফলাফল নির্ভরযোগ্য হয় না এবং এর কার্যকারিতাও হ্রাস পায়।

চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বীমা খাতে এআই বিনিয়োগের আগ্রহ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এএম বেস্টের তথ্য অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশ বীমা প্রতিষ্ঠান ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে এআই বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এটি শিল্পের প্রযুক্তি গ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত দেয়।

যেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এআই ব্যবহার করছে, তাদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ সীমিত হলেও উৎপাদনশীলতায় উন্নতি লক্ষ্য করেছে বলে জানিয়েছে। পাশাপাশি ১১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর্মীপ্রতি উৎপাদনে পরিমাপযোগ্য উন্নতি অর্জনের কথা জানিয়েছে। যদিও এই অগ্রগতি এখনো সীমিত পরিসরে, তবুও এটি এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রাথমিক প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে গবেষণা প্রতিবেদনগুলো থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, বীমা খাতে এআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক কাঠামো পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সুফল অর্জনের জন্য ডেটা একীকরণ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং পুরোনো সিস্টেম সংস্কারের মতো মৌলিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

Leave a Comment