স্থলাভিষিক্ততার মতবাদ

স্থলাভিষিক্ততার মতবাদ – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ” অধ্যায়ের একটি পাঠ। স্থলাভিষিক্ততার নীতির যথার্থ প্রয়োগ ও কার্যকারিতার জন্যে কতিপয় আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য অবশ্যই বিদ্যমান থাকা প্রয়োজন। ঘোষ ও আগরওয়ালা যদিও কিছু প্রতীকী বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন। তবে, এম. এন. মিশ্র নিম্নে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যসমূহের কথা উল্লেখ করেছেনঃ-

স্থলাভিষিক্ততার মতবাদ

স্থলাভিষিক্ততার মতবাদ | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

১. এ নীতিটি ক্ষতিপূরণের নীতির অনুগামী (This Principle is the corollary to the Principle of Indemnity) :

স্থলাভিষিক্ততার নীতিটি ক্ষতিপূরণের নীতির পরবর্তী বা অনুগামী নীতি অথবা স্বাভাবিক ফল হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। কেননা, ক্ষতি না হলে বা ক্ষতিপূরণ করা না হলে স্থলাভিষিক্ততার প্রশ্ন আসে না। তাও সামগ্রিক ক্ষতি হলে এবং তা বীমাকারী কর্তৃক সম্পূর্ণ পূরণ বা পরিশোধ করে দিলেই স্থলাভিষিক্ততার নীতিটি প্রয়োগযোগ্য হয়।

যেমন : – কোন পণ্য বোঝাই জাহাজ ডুবে গেলে এবং সহজে উদ্ধারযোগ্য না হলে বীমাকারী সাধারণতঃ এটিকে সামগ্রিক ক্ষতি গণ্য করে বীমাগ্রহীতা/বীমাগ্রহীতাদের সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ করে দিতে পারেন এবং পরবর্তীতে জাহাজ ও পণ্যের যা কিছু উদ্ধার করা সম্ভব হয়, স্বাভাবিকভাবেই তার মালিকানায় (পূর্ব মালিকের স্থলে) বীমাকারী অভিষিক্ত হন বা প্রতিকল্প মালিক বা উত্তমর্ণ হিসেবে গণ্য হন। সুতরাং, সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ করে দেয়ার পরেই কেবল এ নীতি কার্যকর হতে পারে। যেখানে ক্ষতিপুরণ নেই, সেখানে স্থলাভিষিক্ততাও নেই। সেকারণেই, ব্যক্তিগত বীমায় স্থলাভিষিক্ততার নীতি কার্যকর নয়।

 

২. স্থলাভিষিক্ততা হলো বিকল্পতা বা প্রতিকল্পতা (Subrogation is the substitution) :

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ মতবাদ বা নীতি অনুযায়ী বীমাকারী কর্তৃক সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের পরে বীমাকৃত তথা ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্ঘটনা কবলিত সম্পদ-সম্পত্তির যা কিছু উদ্ধার করা যায় তার উপর বীমাগ্রহীতার যে অধিকার বিদ্যমান ছিল, সে অধিকার বীমাকারীর কাছে চলে যায়। কেননা, বীমাকারী সম্পদ-সম্পত্তির প্রকৃত ক্ষতিপূরণ করে দিয়েছেন। একে বলা যায় মালিকানায় বিকল্পতা (Substitution) তথা প্রতিকল্পতা (Subrogation)।

 

৩। পরিশোধের পরিমাণ বা মাত্রা পর্যন্তই শুধু স্থলাভিষিক্ততা (Subrogation is only upto the amount of payment) :

বীমাকারী কর্তৃক বীমাকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ-সম্পত্তির সম্পূর্ণ ক্ষতিপুরণ প্রদান করার পরে বীমাকারী উক্ত ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির যাবতীয় অধিকার, দাবী, প্রতিকার (Remedies) ও প্রতিভূতিসমূহ (Securities)-তে (মালিকানায়) প্রতিকল্পিত বা স্থলাভিষিক্ত হন বটে; কিন্তু, তিনি এসব সুবিধে তত পরিমাণ অর্জন করবেন, যতপরিমাণ তিনি পরিশোধ করেছেন; তার বেশী নয়।

যুক্তরাষ্ট্রীয় একটি মোকদ্দমার রায়ে বলা হয়েছিল – “If the insurer, having paid the claim to the insured, recovers from the defaulting third party in excess of the amount paid under the policy, he has to pay this excess to the insured though he may charge the insured his share of reasonable expenses incurred in collecting. “— অর্থাৎ, বীমাগ্রহীতাকে পরিশোধ করার পরে যদি বীমাকারী অভিযুক্ত তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে উক্ত বীমাপত্র বাবদ পরিশোধিত পরিমানের অধিক উদ্ধার করতে সক্ষম হন, তাহলে এ অতিরিক্তটুকু বীমাগ্রহীতাকে প্রদান করতে হবে – পারেন। 

 

স্থলাভিষিক্ততার মতবাদ | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

৪। পরিশোধের আগে থেকেও স্থলাভিষিক্ততার নীতি প্রযুক্ত হতে পারে (The subrogation may be applied before payment) :

যদি এমন হয় যে, বীমাকারী কর্তৃক সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণের আগেই বীমাগ্রহীতা তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে কিছু ক্ষতিপুরণ লাভ করেছেন, তাহলে বীমাকারী বীমাগ্রহীতা কর্তৃক লৱ ক্ষতিপুরণের পরে অবশিষ্ট ক্ষতিই শুধু পূরণ করে দিবেন। অর্থাৎ, ক্ষতিপুরণের আগেও এনীতি প্রযুক্ত হতে পারে।

 

৫। বক্তিগত বীমা (Personal Insurance) :

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্যক্তিগত বীমায় বা জীবন বীমার ক্ষেত্রে এ নীতি প্রযুক্ত হয় না। কেননা, ব্যক্তিগত বীমা বা জীবন বীমা ক্ষতিপুরণের বীমা নয়, যে কারণে জীবনের ক্ষেত্রে ক্ষতি নিরূপণযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে, বীমাকারী তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণে অধিকার রাখেন না। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ্য যে, বীমাগ্রহীতা যদি তৃতীয় পক্ষের অবহেলার কারণে মারা যান, তাহলে বীমাগ্রহীতার পোষ্যগণ তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে বীমাপত্রের মূল্যসহ ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেন। এখানে বীমাপত্রের কোন অধিকারেই বীমাকারী স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন না।

এ সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা ও বর্ণনা থেকে বলা যায় যে, স্থলাভিষিক্ততার নীতিটি কার্যকর বা প্রযুক্ত করার ক্ষেত্রে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি বিদ্যমান থাকা একান্ত বিবেচ ও অপরিহার্য।

Leave a Comment