বৈশ্বিক মোটর বিমা শিল্প এক অভাবনীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েনল (CoinLaw) নামক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে গাড়ি বিমা প্রিমিয়ামের হার ও চাহিদা উভয়ই ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। ক্রমবর্ধমান যানবাহনের সংখ্যা এবং উচ্চমূল্য নির্ধারণের ফলে ২০২৬ সাল নাগাদ বৈশ্বিক গাড়ি বিমা বাজারের আকার ২.১৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাজার প্রবৃদ্ধির গতিধারা ও পরিসংখ্যান
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সাল থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত এই খাতটি ৬.০৫ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারে (CAGR) বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে ২০৩১ সাল নাগাদ এই বাজারের মোট আর্থিক মূল্যমান দাঁড়াবে প্রায় ২.৮৬ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্য একটি পৃথক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মোটর বিমা বাজারের মূল্য ছিল ৯৭৬.১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩৪ সাল নাগাদ ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। ২০২৬ সাল পরবর্তী সময়ে এই প্রবৃদ্ধির হার হবে প্রায় ৬.৭০ শতাংশ।
নিচে বৈশ্বিক গাড়ি বিমা ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বাজারের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির একটি তুলনামূলক সারণি তুলে ধরা হলো:
| খাতের নাম | প্রাক্কলিত বছর | বাজার মূল্য (মার্কিন ডলারে) | প্রবৃদ্ধির হার (CAGR) |
| গাড়ি বিমা বাজার | ২০২৬ | ২.১৩ ট্রিলিয়ন | ৬.০৫% (২০৩১ পর্যন্ত) |
| মোটর বিমা খাত | ২০৩৪ | ১.৭৫ ট্রিলিয়ন | ৬.৭০% (২০২৬ থেকে) |
| বিমায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) | ২০৩১ | ১১৪.৫২ বিলিয়ন | ৩৪.২% |
| ইউসেজ-বেজড বিমা (UBI) | ২০৩০ | ২৪৩.৩২ বিলিয়ন | ২৩.১% |
প্রযুক্তির বিপ্লব: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেলিমেটিক্স
গাড়ি বিমা খাতের এই বিশাল প্রবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে আধুনিক প্রযুক্তি। বর্তমানে বিমা কোম্পানিগুলো আন্ডাররাইটিং (ঝুঁকি মূল্যায়ন) এবং দাবি নিষ্পত্তির (Claims) ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহার করছে। ২০২৬ সালে বিমা খাতে এআই-সংক্রান্ত রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬.৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩১ সাল নাগাদ ১১৪.৫২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। অর্থাৎ এই খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার হবে চমকপ্রদ ৩৪.২ শতাংশ।
শিল্প জরিপগুলোতে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় সব বড় বিমা প্রতিষ্ঠান এখন এআই-চালিত ভার্চুয়াল এজেন্ট এবং চ্যাটবট ব্যবহার করছে। গ্রাহকদের দাবি-সংক্রান্ত প্রাথমিক যোগাযোগের ৬০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশই এখন এই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন বিমা কোম্পানির পরিচালনা ব্যয় কমাচ্ছে, অন্যদিকে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করে গ্রাহক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করছে।
ইউসেজ-বেজড ইন্স্যুরেন্স (UBI)-এর উত্থান
আধুনিক বিমা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো ‘ইউসেজ-বেজড ইন্স্যুরেন্স’ (UBI) বা ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে বিমা। টেলিমেটিক্স প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে গাড়ি চালকের আচরণের ওপর ভিত্তি করে এখন বিমা প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। এই বাজারের আকার ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ২৪৩.৩২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার হবে প্রায় ২৩.১ শতাংশ। এর ফলে নিরাপদ ড্রাইভিং উৎসাহিত হবে এবং বিমা খাত আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক হয়ে উঠবে।
পরিশেষে বলা যায়, মুদ্রাস্ফীতি ও বিমা পলিসির মূল্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং বিশ্বজুড়ে যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদাই আগামী কয়েক বছর এই বাজারকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে।
