সমর্পণ মূল্যের সংজ্ঞা

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় “সমর্পণ মূল্যের সংজ্ঞা” যা জীবন বীমা অধ্যায়ের অর্ন্তভুক্ত।

সমর্পণ মূল্যের সংজ্ঞা

 

সমর্পণ মূল্যের সংজ্ঞা

 

মানুষ প্রায় সব সময়ই কমবেশী প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মোকাবেলা করে জীব চালাতে বাধ্য হয়। বেঁচে থাকার জন্যে সে জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে আধুনিক সমাজে বীমা তার মধ্যে একটি অন্যতম ব্যবস্থা। কিন্তু, পৃথিবীতে মানুষের সব আশাই এবং সব চেষ্টাই সফল হয় না। যে মানুষটি জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে আশা করে একটি বীমাপত্র গ্রহণ করেছিলেন। – হয়ত জীবনের সংকট এমন হতে পারে হয়ত পরিস্থিতি এমন হতে পারে যে – বীমাপত্রটি চালিয়ে নেয়ার শক্তিটুকুও তার রইল না।

যদিও ভিন্ন কারণে তা হতে পারে। কিন্তু, তা ততটা সাধারণ ঘটনা নয়। যাই হোক, কোন কারণে কোন বীমাকৃত ব্যক্তি বা বীমাপত্রধারী যদি বীমাকিস্তি প্রদান করতে অসমর্থ হন অথবা ব্যর্থ হন তাহলে বীমাগ্রহীতা বীমাকারীর কাছে তার বীমাপত্রটি সমর্পণ করতে পারেন এবং তিনি এতদিন যে প্রিমিয়াম প্রদান করেছেন – বিপদে বা প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা লাভের আশায় তা থেকে স্বাভাবিক কারণেই বঞ্চিত হলেও একটি উপশম অথবা (কিস্তি প্রদানের প্রতিদানে) একটি আর্থিক প্রতিদান বা মূল্য চাইতে পারেন।

বীমাপত্র সমর্পণ করে এই যে মূল্য চাওয়া হয়, একে বলা হয় সমর্পণ মূল্য (Surrender Value)/ কিন্তু, এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে – মর্পণ মূল্য চাওয়া যায় এবং পাওয়াও যায়, তবে, সব ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায় না। কেননা, বীমাপত্রটি ইস্যু করা বা প্রদানকরা পর্যন্ত যে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা বীমাকারী বা বীমা প্রতিষ্ঠানকে পালন করতে হয় তাতে বেশ অর্থ খরচ হয়ে থাকে এবং যতদিন বীমাপত্রটি চালু ছিল ততদিন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের যে সাধারণ খরচাবলী থাকে তারও একটি অংশ ঐ বীমাপত্রটির উপর বর্তায়। উপরন্তু, বীমাপত্রটি সমর্পণের জন্যেও বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই তার জন্যেও বীমাকারীর বিভিন্ন খরচ হয়ে থাকে।

এসব বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করে বীমা প্রতিষ্ঠানের হিসেব শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞগণ যদি দেখেন যে – এসব খরচ কাটিয়ে প্রদেয় উদ্বৃত্ত থাকে তাই সমর্পণ মূল্য হিসেবে দেয়া হয়। এসব বিচার – বিশ্লেষণের ও অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায় যে – কমপক্ষে ২ বছর মেয়াদ উত্তীর্ণ না হলে সাধারণতঃ সমর্পণ মূল্য প্রদান করা যায় না। এ অভিজ্ঞতার আলোকেই বীমা প্রতিষ্ঠান গুলো সাধারণতঃ ২/৩ বছর মেয়াদ পর্যন্ত বীমাকিস্তি প্রদান করা হয়ে থাকলে সে বীমাপত্রেই সমর্পণ মূল্য প্রদান করে থাকে।

বীমাগ্রহীতাদের কাছ থেকে সংগৃহীত বীমাকিত্তি বা সেলামীর অর্থ সঞ্চিত হয়ে যে তহবিল সৃষ্টি হয় — সেখান থেকেই সমর্পণ মূল্য প্রদান করা হয়। স্বাভাবিক কারণেই উক্ত তহবিলের মালিক বীমাগ্রহীতাগণ এবং বীমাকারী তার জিম্মাদার। প্রত্যেক বীমাগ্রহীতা উক্ত তহবিলের অংশীদার এবং বীমাপত্র প্রতি উফ সাধারণ তহবিলের প্রাপ্য অংশকেই বীমাপত্রের তহবিল মূল্য (Fund Value) বলা হয়। সাধারণতঃ বীমাপত্রের প্রথমদিকে এই তহবিল মূল্য কম থাকে এবং বীমাপত্র যত বেশীদিন চালু থাকে, এ তহবিলের মূল্য তত বৃদ্ধি পেতে থাকে।

 

উল্লেখ্য, যে পরিমান অর্থ প্রিমিয়াম হিসেবে বীমাগ্রহীতা বীমাকারীকে প্রদান করে থাকেন তা সম্পূর্ণই সমর্পণ মূল্য হিসেবে প্রদান করা হয় না। কেননা, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিটি বীমাপত্রেই চুক্তি থেকে আরম্ভ করে তার সমর্পণ পর্যন্ত নানাবিধ আনুষ্ঠানিকতা পালন করার জন্যে বেশ কিছু পরিমান অর্থ খরচ হয়ে থাকে। তাছাড়া, প্রায়ই দেখা যায় যে, অপেক্ষাকৃত সুস্থ বীমাগ্রহীতাগণই বীমাপত্র সমর্পণ করেন এবং রুগ্ন বীমাগ্রহীতাগণ যে করেই হোক বীমাপত্রটি চালু রাখার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তাই, সুস্থ বীমাগ্রহীতাগণ চলে গেলে অপেক্ষাকৃত রুগ্ন বীমাগ্রহীদের জন্যে বীমাকারীর ঝুঁকি বেড়ে যায়। উপরন্তু, নতুনদের উক্ত দলে অন্তর্ভুক্ত করতে অতিরিক্ত খরচ হয়।

উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করে বীমাকারীগণ সাধারণতঃ মুনাফাবিহীন বীমাপত্রে প্রদত্ত বীমাকিস্তির পরিমানের শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ এবং মুনাফাযুক্ত বীমাপত্রে শতকরা ৪০ ভাগের মত সমর্পণ মূল্য প্রদান করে থাকেন। তবে, এ হিসেবে বীমাপত্রে প্রদত্ত ১ম বছরের বীমাকিত্তির উপরে সমর্পণ মূল্য হিসেব করা হয় না, অন্যান্য বছরের প্রিমিয়ামের উপর হিসেব করা হয়। যদিও নির্দিষ্ট নিয়ম ও সুত্র অনুযায়ী সমর্পণ মূল্য হিসেব করা হয়ে থাকে।

যাই হোক, বিভিন্ন গ্রন্থকার সমর্পণ মূল্যের যে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন তার কয়েকটি নিম্নে প্রদান করা হলো :

ঘোষ ও আগরওয়ালার মতে – “If the insured finds it impossible to continue paying premium on a policy.he can surrender it to the insurance company and acquire what is known as Surrender Value” (যদি বীমাকৃত ব্যক্তি তার বীমাপত্রের কিত্তি পরিশোধ করে বীমাপত্র চালু রাখতে অসমর্থ হন, তাহলে তিনি তার বীমাপত্রটি বীমাকারীর কাছে সমর্পণ করতে পারেন এবং সমর্থণ করে কিছু মূল্য আদায় করতে পারেন যাকে সমর্পণ মূল্য বলা হয়)”।

এম. এন. মিশ্র বলেছেন ” Surender Value is that amount of premiums paid which is returned to the policy-holder at the time of surrendering the policy (সমর্পণ মূল্য হলো পরিশোধিত প্রিমিয়ামের সেই পরিমান বা অংশ যা বীমাপত্রটি সমর্পণের সময় বীমাগ্রহীতাকে ফেরত প্রদান করা হয়)”।

 

সমর্পণ মূল্যের সংজ্ঞা

 

উপরোক্ত বর্ণনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে – বীমাগ্রহীতা কোন কারণে বীমাপত্র চালু রাখার জন্যে কিস্তি প্রদানে ব্যর্থ হয়ে বীমাকারীর কাছে বীমাপত্র সমর্পণ করলে এবং মেয়াদাধীন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (২/৩ বছর) বীমাকিত্তি প্রদানের প্রতিদানে দাবীর প্রেক্ষিতে এবং রীতি অনুযায়ী বীমাকিস্তি হিসেবে প্রদত্ত অর্থের নির্দিষ্ট পরিমানের (২৫ থেকে ৪০ ভাগ পর্যন্ত) অর্থ মূল্য বীমাকারী কর্তৃক প্রদান করা হলে, তাকেই সমর্পণ মূল্য বলা হয়।

Leave a Comment