সমর্পণ মুল্য নির্ধারণ বা হিসেবকরণের ভিত্তিসমূহ

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় “সমর্পণ মুল্য নির্ধারণ বা হিসেবকরণের ভিত্তিসমূহ” যা জীবন বীমা অধ্যায়ের অর্ন্তভুক্ত।

সমর্পণ মুল্য নির্ধারণ বা হিসেবকরণের ভিত্তিসমূহ

 

সমর্পণ মুল্য নির্ধারণ বা হিসেবকরণের ভিত্তিসমূহ

 

আধুনিক বীমা কারবারীগণ প্রতিযোগিতামূলকভাবে বীমাগ্রহীদের যেসব সুযোগ-সুবিধে প্রদান করে থাকেন তার মধ্যে সমর্পণ মূল্য প্রদান অন্যতম। কোন বীমাগ্রহীতা যদি কোন কারণে বীমাপত্র চালু রাখতে অসমর্থ হন, তাহলে তার আবেদনের প্রেক্ষিতে বীমাকারী প্রদত্ত প্রিমিয়ামের একটি নির্দিষ্ট অংশ বীমাগ্রহীতাকে প্রদান করেন যা সমর্পণ মূল্য নামে অভিহিত হয়। এই সমর্পণ মূল্য প্রদানে যদি কোন নির্দিষ্ট নিয়ম- নীতি অনুসৃত না হয় বা সমর্পণ মূল্য দেয়া হবে কিনা, দেয়া হলে কি পরিমান দেয়া হবে সে বিষয়ে যদি যথার্থ কোনসিদ্ধান্ত গৃহীত না হয় তথা সমর্পণ মূল্য যথার্থভাবে হিসেব করা বা নির্ধারণ করা না হয়, তাহলে ধীমা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি অনিবার্য হয়ে পড়তে পারে। তাই, সমর্পণ মূল্য নির্ধারণের জন্যে বীমাকারীগণ দু’টি পন্থা বা ভিত্তি অনুসরণ করে থাকেন। যথা :

(১) পুঞ্জীকরণ বা পুঞ্জীভবন পদ্মা (The accumulation Approach) ও (২) সঞ্চয়ন পন্থা (The Saving Approach) I

নিম্নে এ দুটি পন্থা বা ভিত্তি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলো : –

১। পুঞ্জীকরণ বা পুঞ্জীভবন পন্থা (Accumulation Approach):

বীমাপত্রসমূহের নীট প্রিমিয়ামের উপর আরোপিত অতিরিক্ত খরচাবলী পুঞ্জীকরণের মাধ্যমে যে তহবিল সৃষ্টি হয় তা থেকে সমর্পণ মূল্য প্রদান করা হয়। এ থেকে যেসব বীমাপত্রের উপর সমর্পণ মূল্য প্রদান করতে হয়—সেসব বীমাপত্রে স্বাভাবিককারণেই বীমাদাবী পরিশোধ করতে হয় না। তবে, সেসব বীমাপত্রখাতে যে পুঞ্জীকৃত সঞ্চিতি হয় তা দিয়ে দেয়া উচিত বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু, তা সব দিয়ে দিলে বীমাকারীর জন্যে হয়ত তেমন কিছুই থাকবে না। উপরন্ত, ঐসব বীমাপত্রের সমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতেই অনেক খরচের প্রয়োজন হয়।

এ পন্থায় সব ধরনের বীমাপত্রের উপরই সমর্পণ মূল্য বাবদ তহবিল পুঞ্জীকরণ ও সংরক্ষণ করা হয়। অথচ, সাময়িক বীমাপত্র, বিশুদ্ধ মেয়াদী বীমাপত্র এবং এরূপে আরও বেশ কিছু বীমাপত্রে সমর্পণ মূল্য প্রদান করা হয় না। কারণ, এসব বীমাপত্রে এমনিতেই অনেক সময় বীমাদাবী পরিশোধ করতে হয় না। তাই, এ ধরনের বীমাপত্রে সমর্পণ মূল্য প্রদান করলে তা প্রকৃতপক্ষে লোকসান সৃষ্টির অহেতুক কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ পদ্ধতিতে সঞ্চিতিকে সমর্পণ মূল্য প্রদানের আধার হিসেবে গণ্য করা হয়।

আর, সঞ্চিতি হিসেব করা হয় মোট প্রিমিয়ামের উপর। সংগৃহীত প্রিমিয়াম থেকে সব খরচাবলীও বাদ দেয়া হয়। এভাবে সকল প্রদত্ত প্রিমিয়াম এবং তার সাথে অর্জিত সুদ যুক্ত হয়ে যে (মোট) পরিমান অর্থ দাঁড়ায় তা থেকে মৃত বীমাগ্রহীতাদের দাবীর আনুপাতিক অংশ ও বীমাকারীর সমগ্র খরচাদি বাদ যাওয়ার পরে যা থাকে তাকেই সঞ্চিতি হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু, কোন নির্দিষ্ট বীমাপত্র বাবদ সৃষ্ট সঞ্চিতির সম্পূর্ণটাই সমর্পণ মূল্য হিসেবে প্রদান করা যাবেনা যার কারণ আগেই উল্লেখিত হয়েছে।

 

সুতরাং, সমর্পণ মূল্য = সাকলা সঞ্চিতি – সমর্পণ খরচাবলী। প্রসঙ্গতঃ ধারণার স্পষ্টতার জন্যেই সমর্পণ খরচাবলী সম্পর্কে কিছুটা বর্ণনা প্রদান করা প্রয়োজন। নিম্নে এ ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলোঃ-

(ক)প্রাথমিক খরচাবলী (Primary Expenditures) :

বীমাচুক্তি গঠন ও সম্পাদনের প্রাথমিক কতকগুলি আনুষ্ঠাকতা রয়েছে। যেমন: – প্রস্তাবনার যাবতীয় প্রক্রিয়া নিস্পন্ন করার ও ডাক্তারী পরীক্ষার খরচ, প্রতিনিধির দস্তুরী এবং বীমাপত্র ইস্যু করার খরচাবলী বাবদ প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে। এ খরচের পরিমান এতোটা যে – ১ম বছরের প্রিমিয়ামের অর্থে তা মিটানো যায় না। তাই, পুরো মেয়াদের প্রিমিয়ামের মধ্যে তা বণ্টন করে দেয়া হয়।

(খ) প্রতিকূল মৃত্যুহার নির্বাচন (Adverse Mortality Selection) :

যে সব বীমাগ্রহীতা খুবই দুর্বল ও রুগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী তারা বীমাপত্র কোনমতেই সমর্পণ করেন না; বরং, যারা সমর্পণ করেন তারা সাধারণতঃ সু- স্বাস্থ্যের অধিকারী এবং যারা অপেক্ষাকৃত বেশীদিন বেঁচে থাকবেন তারা। ফলে, যারা থেকে যান তাদের মৃত্যুহার আরও বেশী হয়, যার বোঝা বীমাকারীর উপর পড়ে। এ জন্যে সমর্পণের সময় মূল্য প্রদানের ক্ষেত্রে বীমাকারীকে যথাযথ সমন্বয় সাধন সাপেক্ষেই তা করা উচিত।

(গ) মন্দাকালীন সমর্পণের বাড়তি খরচাদি (Excess Expenditures for surendering at the time of depression):

কারবারে মন্দা দেখা দিলে, বীমাপত্র সমর্পণের হিড়িকে প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে ফেলে এবং তহবিল কমে নিম্নতর পর্যায়ে চলে যায়। এসব সময়ে বীমাকারীকে প্রতিষ্ঠানের কিছু সম্পত্তি বিক্রি পর্যন্ত করে ফেলতে হয়। এভাবে সমর্পণের আর্থিক ফলাফল প্রতিষ্ঠানের যথেষ্ট অসুবিধার কারণ হয়ে থাকে। তাই, এরূপ ক্ষেত্রে সমর্পণ মূল্য, কোন কারণেই বিনিয়োগকৃত অংশ থেকে যা পাওয়া যায় তার বেশী হওয়া উচিত নয়।

(ঘ) আপদকালীন সঞ্চিত তহবিলে বরাদ্দরক্ষণ(Contribution to Contingency Reserve) :

অনেকসময় বীমাকারী আর্থিক দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার জন্যে একটি তহবিল সৃষ্টি করে রাখেন যেখানে প্রত্যেক বীমাগ্রহীতা বা বীমাপত্র বাবদ নির্দিষ্ট পরিমানের অর্থ রাখতে হয় যা তার নিজের পকেট থেকে রাখা সম্ভব নয় এবং তা কারবারী রীতিও নয়। সুতরাং, সমর্পণ মূল্য নিরূপণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও বীমাকারীকে বিবেচনা করতে হয়।

(ঙ) মুনাফাখাতে অর্থ সংরক্ষণ (Contribution to profit ) :

কারবারের মুনাফা খাতে প্রতিটি বীমাপত্র বাবদ একটি স্বাভাবিক আর্থিক অংশগ্রহণ বর্তায়। অর্থাৎ, প্রত্যেক বীমাপত্র বাবদ মুনাফা খাতে কিছু অর্থ বণ্টিত হয় বা বীমাপত্রের সমর্পণের ফলে বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং, এরূপ আর্থিক ক্ষতিকেও সমর্থণ মূল্য হিসেবকরণে বিবেচনা করতে হয়।

(চ) সমর্পণের খরচ (Cost of Surrender) :

বীমাপত্রটি যখন সমর্পণ করা হয়, তখন সমর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বেশ কিছু পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় । অনেক সময় অন্যান্য খরচসমূহের ন্যায় সমর্পণ প্রক্রিয়ার খরচও বীমার মেয়াদব্যাপী প্রিমিয়ামসমূহের উপর জুড়ে দেয়া হয়। কোন বীমাপত্র দ্রুত সমর্পণ করা হলে বণ্টনকৃত সমর্পণ মূল্যের অনেকাংশ অপ্রাপ্ত থেকে যায়। ফলে, উক্ত বীমাপত্রে সমর্পণ মূল্য প্রদানের জন্যে সঞ্চিতি থেকে সে অংশ কেটে নিতে হয়।

 

সমর্পণ মুল্য নির্ধারণ বা হিসেবকরণের ভিত্তিসমূহ

 

২। সঞ্চয়ন পদ্ধতি বা পন্থা (Saving Appoach) :

চুক্তি মোতাবেক বা যখন প্রয়োজন হয় বীমাকারীকে বীমাদাবী পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু, কোন বীমাপত্র করা হলে, বীমাকারী সে বীমাপত্রের বীমাদাবী পরিশোধের দায় থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। বীমাদাবী পরিশোধ করা থেকে অব্যাহতি পেলে স্বাভাবিক কারণেই বীমাকারী বীমাকৃত ব্যক্তিকে বা বীমাগ্রহীতাকে কিছু অর্থ ফেরত দিতে পারেন। কিন্তু, কিছু কিছু বীমাপত্র রয়েছে যার বীমাদাবী দিতে হতে পারে, নাও হতে পারে। যেমনঃ – সাময়িক বীমাপত্র ও বিশুদ্ধ মেয়াদী বীমাপত্র। সেসব বীমাপত্রে বীমাকারীসমর্পণ মূল্য দিতে বাধ্য বা দায়বদ্ধ নন। এসব বীমাপত্রে সমর্পণ মূল্য দেয়া হলে বীমাকারী বরং ক্ষতিগ্রস্ত হন। .

এদিকটি লক্ষ্য করেই সমর্পণ মূল্য নির্ধারণের সঞ্চয়ন পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছে। এ পদ্ধতিতে সমর্পণ মূল্য পরিশোধের কারণ প্রকাশ করা হয়। এ জন্যেই এ পদ্ধতিটিকে বিজ্ঞান সম্মত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ পদ্ধতিটিতে, বীমাদাবীর পরিবর্তে সমর্পণ মূল্য পরিশোধ করা হয়। বোঝার বিষয় এই যে, পরিশোধ না করার ফলে কি পরিমাণ সঞ্চয় হলো তা বীমাপত্রের মেয়াদ শুরু থেকে বীমাদাৰী সমর্পণ পর্যন্ত এবং তারিখ থেকে বীমাপত্রের মেয়াদ পূর্তি অথবা বীমাকৃত ব্যক্তির মৃত্যু অবধি বিভিন্ন লেনদেন ও বিষয়াদি বিবেচনার পরেই হিসেব করা সম্ভব।

বীমাপত্রটি সমর্পিত না হয়ে যদি চালু থাকত, তাহলে বীমাকারী কিস্তির অর্থ এবং বিনিয়োগকৃত কিস্তি বাবদ সুদ পেতেন; পক্ষান্তরে, কিছু খরচ করা হতো। কিন্তু বীমাপত্র সমর্পণ করা হলে উক্ত আয়গুলি বা ভবিষ্যতের খরচগুলিও হতো না।

যাই হোক, উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে সমর্পণ মূল্য নির্ধারণের একটি ধারণা নেয়া যেতে পারে। নিম্নে বর্ণিত সুত্রের সাহায্যে কোন বীমাপত্রে সমর্পণ মূল্য হিসেব করা হয় – 

সমপর্ণ মূল্য = (বীমাকৃত অর্থ-ভবিষ্যৎ খরচাবলী খাতে পুঞ্জীকৃত অর্থ+অংশগ্রহণকারী বীমাপত্রে ভাবীস্বত্ব বিশিষ্ট বোনাস)- (ভবিষ্যতে প্রাপ্য বীমাকিস্তির পুঞ্জীকৃত পরিমাণ সমর্পণ মূল্য প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার খরচাবলী।)

সমর্পণ মূল্য হিসেবের এ কাজটি গণনা বিশেষজ্ঞগণই সম্পন্ন করে থাকেন। তারা সব কিছু বিবেচনা ও হিসেব-নিকেশ করেই সর্বাধিক সমর্পণ মূল্য প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট থাকেন।

Leave a Comment