নৌ-বীমার অধীন বিভিন্ন সামুদ্রিক বিপদসমূহ

আজকের আলোচনার বিষয় “নৌ-বীমার অধীন বিভিন্ন সামুদ্রিক বিপদসমূহ ” যা নৌ বা সামুদ্রিক বীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।সামুদ্রিক বিপদসমূহই হচ্ছে – সামুদ্রিক ঝুঁকি ও ক্ষতির কারণ। সমুদ্র পথে চলতে বিশেষতঃ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে মানুষ তাই যে সব বিপদের সম্মুখীন হয়েছে বিভিন্ন সময়ে বাস্তব কারণেই, সেসব বিপদ থেকে রক্ষা বা অব্যাহতি পেতে মানুষকে হতে হয়েছে সতর্ক এবং সেগুলোকে চিহ্নিত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাই, সামুদ্রিক বিপদ সম্পর্কে বিভিন্নজন যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তার কয়েকটি অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলোঃ

Table of Contents

নৌ-বীমার অধীন বিভিন্ন সামুদ্রিক বিপদসমূহ

 

নৌ-বীমার অধীন বিভিন্ন সামুদ্রিক বিপদসমূহ

 

লর্ড হারসচেল (Lord Harschell)-এর মতে পূর্ণ ধারণাতীত কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনারূপেই সামুদ্রিক বিপদের উদ্ভব বা সৃষ্টি হয়ে থাকে। কোন অস্বাভাবিক অবস্থায় জাহাজ বা জাহাজ বাহী পণ্যের বিনষ্টকারক বিপদসমূহকেই সামুদ্রিক বিপদের আওতাভূক্ত করা হয়। জাহাজী বীমার অধীনে যদি জাহাজের যন্ত্রপাতির স্বাভাবিক কোন ক্ষয়ক্ষতি হয় বা ত্রুটিপূর্ণ ব্যবহারের কারণে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাহলে তা এ জাতীয় ক্ষতি তথা বীমার আওতাভূক্ত হবে না।

ফিলিপ ( Phillip)-এর মতে “সামুদ্রিক বিপদ বলতে ঝড়-ঝঞ্চা তরঙ্গাঘাত,বজ্রপাত-শীলাঘাত, চড়ায় আটকে পড়া, সংঘর্ষ এবং সাধারণভাবে বীমাকৃত সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সকল কারণ বা দুর্ঘটনার উপাদান হিসেবে বিদ্যমান থাকায় অনিবার্যভাবে বিপদ সংঘটিত করে তাকেই বুঝায়।”

এম. এন. মিশ্রের – “Insurance – and practices” গ্রন্থে সামুদ্রিক বিপদসমূহের সংজ্ঞা ও বর্ণনায় বলা হয়েছে যে – “সামুদ্রিক বিপদসমূহ হলো – সমদ্রে চলাচলের কারণে বা ফলশ্রুতি হিসেবে উদ্ভূত বিপদসমূহ যেমন : সমুদ্রের বিপদসমূহ, আগুন, যুদ্ধ, জলদস্যুতা, ডাকাতি, চুরি, গ্রেপ্তার, আটক, প্রতিবন্ধকতা, বিলম্ব, পণ্য নিক্ষেপ ও অন্যান্য বিপদসমূহ এরূপ যে কোন বিপদ অথবা বীমাপত্রে বর্ণিত যে কোন বিপদ।”

“Marine Perils means the perils consequent on, or incidental to, the navigation of the sea, that is to say. perils of the sea. fire war perils, enemies. pirates, rovers. thieves, captures, seizure. restraints and detainment of princes and peoples. jettisions, bartatry and other perils, either of the like kind or which may be designated by the policy)” |

মোট কথা, সামুদ্রিক বিপদ বলতে সমুদ্রে চলাচলের সময়ে জাহাজ এবং/অথবা পণ্য সংক্রান্ত সকল বিপদ, ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ঘটনাসমূহকেই বুঝায়।নৌ তথা সমুদ্রপথে যেসব বিপদ সংঘটিত হয়ে থাকে সেগুলিকে প্রধানতঃ দু ভাগে ভাগ করা যায়। যথাঃ প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক বা নৈতিক বিপদ। নিম্নে উক্ত উভয় প্রকার সামুদ্রিক বিপদ সম্পর্কে বর্ণনা প্রদান করা হলো :

১। প্রাকৃতিক বিপদ ( Natural Perils) :

সমুদ্র পথে প্রাকৃতিক বা নৈসর্গিক কারণে সংঘটিত বিপর্যয় রা দুর্ঘটনাসমূহকে প্রাকৃতিক বিপদ বলা হয়। যেমনঃ – সামুদ্রিক ঝড়, সমুদ্র গর্ভে নিমজ্জিত বা সৃষ্ট পাহাড় ও ভাসমান বরফ খণ্ডে ধাক্কা লাগা ইত্যাদি। এসব প্রাকৃতিক দুর্ঘটনার উপর মানুষের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং এগুলি সম্পূর্ণ আকস্মিক ও পূর্ব-ধারণাতীত।

 

২। অপ্রাকৃতিক বা নৈতিক বিপদসমূহ ( Un-natural or moral hazards or perils) :

প্রাকৃতিক কারণ ব্যতীত মনুষ্যসৃষ্ট এবং অন্যবিধ কারণে সৃষ্ট বিপদসমূহকে অনৈসর্গিক বা নৈতিক বিপদ বলা হয়। এসব বিপদ সাধারণতঃ মানুষের দ্বারা অথবা মানুষের কার্যকলাপে সৃষ্ট বলে নৈতিক বিপদ বা ঝুঁকিও বলা হয়। নিম্নে এ ধরনের বিপদগুলি সম্পর্কে কিছুটা সবিস্তারে বর্ণনা করা হলো –

(ক) জলদস্যু ( Pirates) :

নৌ তথা সমুদ্র পথে চলাকালীন জাহাজ জলদস্যু কর্তৃক আক্রান্ত ও লুণ্ঠিত হতে পারে। জলদস্যুরা জলপথেই তাদের দস্যুতা চালায়। তবে, অনেকসময় যাত্রীকর্তৃক যদি জাহাজ ছিনতাইকৃত বা লুণ্ঠিত হয়, তাও জলদস্যুতা হিসেবে গণ্য হয়। যদিও প্রাচীন কালে অপেক্ষাকৃত বর্বর মানব গোষ্ঠী এধরনের দস্যুতায় লিপ্ত থাকতো। আজকাল এগুলি নেই বললেই চলে।

(খ) ডাকাত চোর ইত্যাদি । Rovers, thieves etc.) :

ডাকাত জলদস্যুদের মতই। তথাপি, এটুকু পার্থক্য করা যায় যে, ডাকাত জল ও স্কুল-উভয় পথেই দস্যুতা করে থাকে। ডাকাত জাহাজে ডাকাতি করতে পারে, তেমনি চোরও মালামাল চুরি করে নিতে পারে—জাহাজ চলাচলের সময়। মোট কথা, চোর, ডাকাতেও জাহাজের মালামাল লুণ্ঠিত ও ক্ষতি করতে পারে বলে চুরি, ডাকাতি ইত্যাদিও সামুদ্রিক বিপদ হিসেবে পরিগণিত।

(গ) শত্রু (Enemies) :

দেশের এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের শত্রু বা শত্রুপক্ষের জাহাজ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে জাহাজ ও জাহাজের লোকজন এবং মালামালের ক্ষতি সাধিত হতে পারে বিধায় এটিও একটি সামুদ্রিক বিপদ বটে।

(ঘ) যুদ্ধ জাহাজ বা রণপোত ( Man-of-War) :

যে কোন দেশ যুদ্ধজাহাজ দিয়ে জলপথে দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে। যুদ্ধজাহাজের সাথে কোন কারণে সংঘর্ষ হলে দুর্ঘটনা বা বিপদ ঘটে যায়। তাই, এটিও একটি সমুদ্র-বিপদ।

(ঙ) যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার বা বলপূর্বক ও সহসা ধরে ফেলে আটক করা (Capture and Seizure) :

জাহাজ চলাকালীন আন্তঃদেশীয় কোন যুদ্ধ বেধে গেলে এবং সংশ্লিষ্ট দেশের জল-সীমার মধ্য দিয়ে চলতে গিয়ে যদি প্রতিপক্ষীয় পণ্যতরী বা যুদ্ধ সরঞ্জামাদি বহনকারী জাহাজ সন্দেহে বলপূর্বক ও সহসা ধরে ফেলে আটক, গ্রেপ্তার ইত্যাদি করে, তাহলে তা একটি অন্যতম সমুদ্র বিপদ বলে গণ্য হয়ে থাকে।

(চ) শত্রুদেশের সরকার, রাজা, রাজপুত্র এবং জনগণ কর্তৃক প্রতিবন্ধকতা আরোপ বা আটক ও বিলম্বিতকরণ (Restraints and detainments by the Govt, King, Princes and people of enemy country) :

শত্রু দেশের সরকার বা রাজা কর্তৃক যদি পূর্ব-নির্ভারিত সমুদ্র বন্দর ব্যবহারে, নোঙর করতে বা পণ্য খালাস ইত্যাদিতে বাধা দান করা হয় অথবা রাজপুত্র ও জনগণ কর্তৃক কোনভাবে জাহাজ আটক বা বিলম্বিত করা হয়, তাকে সমুদ্র বিপদ হিসেবে পরিগণিত করা হয়ে থাকে।

(ছ) মাষ্টার ও নৌ-কর্মচারীদের প্রতারণা ইত্যাদি (Barratry) :

জাহাজের মাষ্টার অথবা কর্মচারীদের দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ভুল কাজ অথবা জাহাজ বা জাহাজ মালিকের প্রতি ক্ষতিকারক কোন কাজকে এ জাতীয় সমুদ্র বিপদ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ধরনের ক্ষতিকারক বা প্রতারণামূলক কাজ অবশ্যই জাহাজ মালিকের অজ্ঞাতে হয়ে থাকে। চুরি, জাহজে অগ্নি সংযোগ, প্রতারণামূলকভাবে জাহাজ এবং পরিবহণাধীন পণ্যসামগ্রীর মালিকদের অজ্ঞাতে মাষ্টার এবং/অথবা কর্মচারীদের দ্বারা কোন ক্ষতি সংঘটিত হওয়াকে এজাতীয় বিপদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

(জ) হরতাল, ধর্মঘট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেসামরিক আন্দোলন ইত্যাদি ( Strike, Riots and civil commotion ) :

পণ্যসামগ্রী গুদাম থেকে জাহাজে তোলা এবং জাহাজ থেকে খালাস করে নির্ধারিত বা যথার্থ স্থানে পৌঁছানো পর্যন্ত সময়ে বা স্থানে যদি হরতাল, ধর্মঘট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অথবা রাজনৈতিক বা বেসামরিক কোন আন্দোলনের ফলে পণ্যসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা সমুদ্রবন্দরে অবস্থানকালীন জাহাজ বা পণ্যসামগ্রীর ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলে তাকে এ জাতীয় বিপদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়।

(ঝ) পণ্য নিক্ষেপ (Jettison) :

ঝড়-ঝঞ্চা বা অন্যবিধ কোন কারণে বিপদগ্রস্ত জাহাজকে হালকা করার জন্যে যদি জাহাজের পণ্য সমুদ্রে নিক্ষেপ করে বিপদমুক্ত করা হয়, তাহলে তাকে পণ্যনিক্ষেপ বলা হয়। তবে, পণ্য নিক্ষেপ অবশ্যই জাহাজকে বিপদমুক্ত করতে ইচ্ছাকৃত হতে হবে। অন্য কোন কারণে পণ্য সমুদ্রে পড়ে গেলে তাকে পণ্য নিক্ষেপ বলা যাবে না।

(ঞ) অগ্নি ( Fire ) :

সমুদ্র পথে চলাকালীন জাহাজ এবং / অথবা পণ্যসামগ্রীতে আগুন ধরে যাওয়া বা অগ্নি সংযোগ হলে তা অন্যতম সমুদ্র বিপদ। হিসেবে গণ্য হয়। ধোঁয়া বা তাপে ক্ষতি সাধন এবং অগ্নি নিবারণে জল প্রক্ষেপনের ফলে সাধিত ক্ষতি বা দুর্ঘটনাও এ জাতীয় অগ্নিজনিত বিপদ হিসেবে গণ্য হয়। বজ্রপাত স্বতঃস্ফুর্ত দহনক্রিয়া, বিস্ফোরণ, কাপ্তান বা জাহাজ কর্মচারীদের অবহেলার জন্যে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও সমুদ্র বিপদ থেকে সৃষ্ট ক্ষতি দায়গ্রহণকারী কর্তৃক অবশ্য পুরণীয়। তবে, বীমাকৃত বিষয়ের অন্তর্নিহিত কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড এর আওতাভুক্ত নয়, এবং বীমাগ্রহীতা কর্তৃক উদ্দেশ্য প্রনোদিত অগ্নিকাণ্ড বীমাকারীর দায়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

(ট) বিস্ফোরণ | Explosion) :

জাহাজ চলাকালীন, পণ্য বোঝাইকরণকালীন অথবা নোঙর করা অবস্থায় উপকূলীয় কোন বিস্ফোরণের ফলে জাহাজ এবং/অথবা পণ্যসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে সমুদ্র-বিপদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

(ঠ) অন্যান্য বিপদসমূহ ( Other Perils) :

অতিরিক্ত লবনাক্ত পানি, পোকায় কাঠকাটা, দুরান্তের যাত্রার জন্যে পথিমধ্যে পরিবাহিত গবাদি পশুর খাদ্যভাবে মৃত্যুও সমুদ্র বিপদ বলে গণ্য। এছাড়া, তেল, তাপ, ইত্যাদি কারণে ক্ষতিসাধিত হওয়াও সমুদ্র বিপদ বলে পরিগণিত হয়ে থাকে।

 

নৌ-বীমার অধীন বিভিন্ন সামুদ্রিক বিপদসমূহ

Leave a Comment