ব্যক্তি এবং পরিবার জীবনে বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ” অধ্যায়ের একটি পাঠ।
বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ:
Table of Contents
ব্যক্তি এবং পরিবার জীবনে বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব
১. বীমা নিশ্চয়তা প্রদান করে (Insurance provides certainty) :
জীবন-জীবিকার প্রতিটি পদক্ষেপে যে অন্তহীন অনিশ্চয়তা বিরাজ করে, বীমা সেখানে সেলামীর প্রতিদানে বীমাগ্রহীতাকে আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদানের অঙ্গীকারে সাহসী, উদ্দীপ্ত, সচল, অধিকতর কর্মক্ষম, কুশলী ও দক্ষ করে তোলে। কেননা, অনিশ্চয়তার শংকা ও ভীতি মানুষকে হতাশ, মানসিকভাবে পঙ্গু ও কর্মক্ষমতাহীন করে ফেলতে পারে যা কোন ব্যাখ্যার অবকাশ রাখেনা।
২. বীমা প্রতিরক্ষা বিধান করে (Insurance provides protection) :
বিপদ-বিপত্তি যাতে না আসতে পারে অথবা আসলেও যাতে ন্যূনতম ক্ষতি হয়, তার জন্যে বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে প্রাক-সতর্কতা এবং যথাবিহিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরামর্শ ও সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করে থাকেন। কেননা, চিকিৎসা বা রোগমুক্তির চেয়ে রোগ প্রতিরোধ শ্রেয়তর (Prevention is better than cure)। অর্থাৎ, বিপদমুক্তির চেয়ে বিপদকে না আসতে দেয়া অনেক ভাল।
৩। বীমা নিরাপত্তা বিধান করে (Insurance provides security) :
বিপদ-আপদ, দুর্ঘটনা, মৃত্যু ইত্যাদি কারণে ক্ষতি সংঘটিত হলে, বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতিপূরণ করে দিয়ে তার নিরাপত্তা বিধান করে থাকেন। ক্ষতিপূরণের এ ব্যবস্থা যদি না থাকত তাহলে মানুষের জীবন-জীবিকা হয়ে পড়ত নিরাপত্তাহীন এবং জীবনযাত্রা হতো বিঘ্নিত। বীমা আপদে-বিপদে মানুষের জীবন নিরাপদ করছে ক্ষতিপূরণ দানের মাধ্যমে।
৪. বীমা মনের শান্তি যোগায় (Insurance affords peace of mind) :
অজস্র যন্ত্রনা আর সমস্যা, বিপদ-আপদ, জড়া-মৃত্যু ইত্যাদির আশংকায় মানুষ এক দারুন অস্বস্তি, অশান্তি আর অস্থিরতার মধ্যে দিন যাপন করে। বীমা এখন মানুষের সে অস্বস্তি, অশান্তি আর অস্থিরতাগুলোকে অনেকাংশে নানাভাবে নিশ্চয়তা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে হ্রাস করে এবং কখনও তা দূর করে মানুষের মনে শান্তির যোগান দিচ্ছে।
৫. বীমা সঞ্চয় সৃষ্টি করে (Insurance creats savings) :
জীবিকা নির্বাহ এবং ভবিষ্যতের অনাকাঙ্খিত আর্থিক ও অন্যবিধ বিপর্যয় এবং অনটন মোকাবেলার জন্যে সঞ্চয় অপরিহার্য। ইঁদুর, পিপিলিকা ইত্যাদি ক্ষুদ্র প্রানী পর্যন্ত ভবিষ্যতের জন্যে সঞ্চয় করে থাকে। জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতিনিধিদের দিয়ে এবং আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষের অত্যন্ত স্পর্শকাতর মানসিক বৃত্তিগুলোকে স্পর্শ করে বীমাপত্র ক্রয় করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। আর, একবার বীমাপত্র ক্রয় করলে তাকে চালু রাখার প্রচেষ্টা থেকেই বীমাগ্রহীতাকে সঞ্চয়ী হতে হয়।
কেননা, তখন থেকে বীমা বাড়তি খরচ না করা অথবা কম খরচ করার জন্যে প্রতিনিয়ত সচেষ্ট বীমাগ্রহীতাকে রাখে। ব্যাংকে বা বাড়ীতে টাকা রাখলে তা সহজেই তুলে খরচ করা যায়। কিন্তু, বীমা সেলামীর টাকা বীমা প্রতিষ্ঠান থেকে যখন তখন তোলা যায় না এবং যথারীতি সেলামী না দিতে পারলে দাবী আদায় করা বা প্রদত্ত পুরো টাকা পাওয়া যায় না বলেই অনেকটা বাধ্য হয়ে তখন বীমাগ্রহীতা সঞ্চয় করতে সচেষ্ট থাকে। জীবন বীমা ছাড়া অন্যান্য বীমায় বীমাগ্রহীতার সঞ্চয় না হলেও বীমা প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয় সৃষ্টি হয়। মোট কথা, বীমা (বিশেষতঃ জীবন বীমা) মানুষকে সঞ্চয়মুখী করে এবং ক্রমান্বয়ে সঞ্চয়ী করে তোলে।
৬. বীমা লাভজনক বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে (Insurance provides profitable investment) :
জীবন বীমার সেলামী বীমা প্রতিষ্ঠানে জমা হয় এবং তার সাথে নির্দিষ্ট হারে সুদ যুক্ত হয় – আবার, সুদের উপরও সুদ যুক্ত হয়ে বিনিয়োগ সৃষ্টি করে। শুধু জীবন বীমাই নয় অন্যান্য বীমা প্রতিষ্ঠানেও সেলামী হিসেবে প্রাপ্ত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খাটানো হয় যা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয়।
৭. বীমা পরনির্ভরতা দূর করে (Insurance eliminates dependency) :
মানুষ সঞ্চয়ী ও বিনিয়োগমুখী হলে মিতব্যয়ী হয় এবং ফলে ক্রমাগত স্বামলম্বী বা আত্মনির্ভর হতে সচেষ্ট হয়। আত্মনির্ভর মানুষ মানুষের মত চলতে ও বাঁচতে পারে যা পরনির্ভর মানুষের পক্ষে কোনমতেই সম্ভব নয়। বীমা পরনির্ভর মানসিকতা দূর করে মানুষের অশেষ কল্যান বিধান করে থাকে।
৮. বীমা ব্যক্তি ও পরিবারের বিবিধ প্রয়োজন মিটায় (Insurance fulfils the multifarious needs of an individual & a family) :
জীবন বীমা নিম্নোক্তভাবে কোন ব্যক্তির এবং পরিবারের বহুমুখী প্রয়োজন মিটাতে সহায়তা করে :-
(I). পারিবারিক প্রয়োজন (Family needs) :
পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যের অকাল মৃত্যুর ফলে তার উপর নির্ভরশীল সদস্যরা অনেক সময় অপরিসীম সমস্যা ও বিপদে নিপতিত হয়। তখন বীমাকারী প্রদত্ত অর্থই অস্তিত্ব রক্ষার এক নির্ভরযোগ্য অবলম্বন হয়।
(ii) বৃদ্ধ বয়সের প্রয়োজন (Old age needs):
বৃদ্ধ বয়সে মানুষ যখন রোজগারে অক্ষম হয়; এমনকি, হিসেব করে খরচ করতেও যেন অক্ষম হয়ে পড়ে, তাদের সাহায্যের জন্যে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলি বিভিন্ন ধরনের বীমাপত্রের ব্যবস্থা রাখে। বৃত্তি প্রকল্পের মাধ্যমে বীমা বৃদ্ধ বয়সে মানুষকে সহায়তা দিয়ে থাকে।
(iii) পুনঃ সমন্বয়ের প্রয়োজন মিটায় (Mitigates the re- adjustment needs) :
অনেক সময় না না কারণে পরিবারের আয়-উপার্জন কমে গেলে সামজিক দায়-দায়িত্ব পালন এবং বিভিন্ন প্রয়োজন মিটানোর ক্ষেত্রে দারুণ অসুবিধার সৃষ্টি হয়। মানুষের এরূপ প্রয়োজনের বিষয়ে বিবেচনা করেই বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ পুনঃ-সমন্বয়ের সুবিধা সম্পন্ন বীমাপত্র প্রচলন করে।
(iv) বিশেষ প্রয়োজনসমূহ মিটায় ( Fulfils the special needs):
বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ বিবিধ সুবিধা সম্পন্ন কিছু বীমাপত্রের প্রচলন করেছে যার মাধ্যমে
(১) ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া,
(২) বিবাহ,
(৩) কর্ম জীবনে প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি সুবিধা প্রদান করে থাকে।

৯. সমাপনী ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তহবিল (Clean-up funds) :
মৃত্যুর পরে হয়ত দেখা যায়, মানুষের পাওনা, খাজনা ইত্যাদি বকেয়া পড়ে আছে ; এমনকি, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্যেও কোন টাকাপয়সা নেই, এমনি অবস্থা মোকাবেলার জন্যে এ বীমাপত্র প্রদান করা হয় যা উত্তরাধিকারী ও উত্তরজীবীদের জন্যে অশেষ কল্যানকর হয়ে থাকে।
১০. বীমা বন্ধকী সম্পত্তি রক্ষা করে (Insurance protects mortgaged property) :
অনেক সময় সম্পদ-সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ করা হয়। তেমন ক্ষেত্রে যদি দেখা যায় যে – (উপার্জনকারী) বন্ধকদাতা মারা গিয়েছেন অথবা টাকা পরিশোধ করে সম্পত্তি ফিরেয়ে আনতে পারছেন না, তাহলে সে পরিবারকে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এ অনাকাঙ্খিত অবস্থা “মোকাবেলার জন্যেই বীমা প্রতিষ্ঠানগুলি এক ধরনের বীমাপত্র চালু করেছে। এ ব্যবস্থাও ব্যক্তি ও পরিবার জীবনের জন্যে অশেষ উপকারী।