আজকের আলোচনার বিষয় “উহ্য/অনুক্ত/অব্যক্ত/অপ্রকাশিত শর্তাবলী ” যা নৌ বা সামুদ্রিক বীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।নৌ-বীমা চুক্তিতে যেসব বিষয় চুক্তি সম্পাদন বা পালনের জন্যে অত্যাবশ্যকীয়, অথচ বীমাপত্রে তার উল্লেখ থাকে না তাকে অনুক্ত বা অব্যক্ত শর্ত (Unexpressed warranties) বলা হয়। অনুক্ত হলেও অত্যাবশ্যকীয় এসব শর্ত পালিত না হলে নৌ-বীমা চুক্তি বাতিল হয়ে যায়।
Table of Contents
উহ্য/অনুক্ত/অব্যক্ত/অপ্রকাশিত শর্তাবলী

প্রসংগতঃ উল্লেখ্য যে, ইংরেজী warranty শব্দটির বাংলা অর্থ কোন কোন ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তাগিদেই গৌন শর্ত করা হয়েছে। কিন্তু, সর্বক্ষেত্রে তা যথার্থ হয়। না। তাছাড়া, একই শব্দের বিভিন্ন অর্থ বিভিন্ন স্থানে হতে পারে (শব্দাংশ উচ্চারণ জোর অনুযায়ী)। তদুপরি, সুপ্রাপ্য অভিধানগুলোতেও waranty-র গৌন শর্ত হিসেবে কোন বঙ্গানুবাদ পাওয়া যায় না।
আর, একটুখানি গভীরভাবে চিন্তা করলেও দেখা যাবে যে, গৌন শর্ত বলে পরিগণিত অথচ মুখ্য শর্তের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে বরং কথাটাকে উল্টিয়ে দেয়াই সঙ্গত। যেদিক থেকেই ভাবা যাক না কেন—বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে [warranty-র বাংলা – অত্যাবশ্যকীয় বিষয় বা শর্ত হিসেবে বলা যায় যা, উল্লেখ থাকুক আর নাই থাকুক, চুক্তি পালনের জন্যে একান্তই অপরিহার্য।
এমন সব শর্ত সম্পর্কে উল্লেখ না থাকলেই তাকে উহা শর্ত বলা হয়েছে। নৌ-বীমার ক্ষেত্রে এটি একটি স্বীকৃত সত্য যে সংশ্লিষ্ট জাহাজটির সমুদ্রে চলাচলযোগ্যতা থাকতে হবে। সমুদ্র যাত্রায় যাবে – চলাচলযোগ্যতা না থাকলে যাবে কি করে। সুতরাং, এসব বিষয় উল্লেখ থাকার অবকাশ রাখে না।যেমনঃ কোন যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে যখন সরকার প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদন শেষে একটি কলেজে শিক্ষকতার জন্যে নিয়োগদান করেন তার নিযুক্তিপত্রে উল্লেখ করার অবকাশ থাকেনা যে—“তাকে কলেজে গিয়ে ক্লাশে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতে হবে। এ কারণেই বলা হয়েছে warranty পালিত না হলে নৌ-বীমাচুক্তি অবশ্যই বাতিল হবে।
ইংরেজী মাধ্যম গ্রন্থেও তাই warranty কে গৌনার্থে গণ্য করা হয়নি; বরং, এম. এন. মিশ্র বলেছেন warranty is not merely a condition but a statement of fact এতে বরং বুঝায় Condition যেখানে শর্ত, Warranty সেখানে শর্ত থেকেও বেশী কিছু বা অন্য কথায় অত্যাবশ্যকীয় শর্ত, মুখ্য অথবা গৌন কথাগুলো ব্যবহার না করাই এক্ষেত্রে নিরাপদ।সে যাই হোক, নৌ-বীমা চুক্তিতে যেসব অত্যাবশ্যকীয় বিষয় উহ্য বা অনুক্ত শর্ত হিসেবে পরিগণিত, সে সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলো :
১। জাহাজের সমুদ্রে চলাচলযোগ্যতা (Seaworthiness of the ship) :
অনুক্ত বা উহ্য শর্তাবলী (Implied warranties)-এর মধ্যে নৌ- বীমার বেলায় জাহাজের সমুদ্রে চলাচলযোগ্যতা প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য বিষয়। সমুদ্র যাত্রার প্রাক্কালে বা যাত্রা শুরু হলে প্রতিটি বিরতির পরেই পূনরারম্ভে জাহাজ অবশ্যই চলাচলযোগ্য হতে হবে। যদিও একই জাহাজ সব সমুদ্র পথগুলির জন্যে উপযুক্ত নাও হতে পারে; আবার, সব জাহাজই কোন একটি পথের জন্যে উপযুক্ত নাও হতে পারে। কেননা, জাহাজের এই যোগ্যতা নির্ভর করে জাহাজের নাবিক ও কর্মচারীদের উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক লস্কর এবং জাহাজের গঠন, আকার, প্রয়োজনীয় কলকব্জা, যন্ত্রপাতি, উপকরণ, সাজ-সরঞ্জাম ইত্যাদির উপর। এ কারণেই, অনেক লেখক চলাচলযোগ্যতা শব্দটির পরিবর্তে এখানে জাহাজের উপযুক্ততা (Fitness) শব্দটি ব্যবহার করতে পরামর্শ দিয়েছেন।
২। যাত্রার বৈধতা (Legality of venture) :
যাত্রার বৈধতা সম্পর্কিত উহ্য শর্ত (Implied warranty) বলতে রীমাকৃত যাত্রা ও যাত্রা পথের বৈধতা বুঝায়। এ শর্তের বরখেলাপ হলে চুক্তি রদ হয়ে যায়। অন্যায় কোন বাণিজ্য যাত্রা, যেমন— শত্রু দেশের সাথে অনুমোদিত ব্যবসায় পরিচালনার উদ্দেশ্যে কোন নৌ-বীমা চুক্তি, বৈধ হবে না।”

৩) অন্যান্য উহ্য শর্তাবলী (Other implied warranties) :
(ক) যাত্রার পরিবর্তন না করা (No change In voyage) :
ইচ্ছাকৃতভাবে ও বিনা কারণে জাহাজ পৌঁছানোর জন্যে নির্ধারিত বদর পাল্টানো যাবে না।
(খ) যাত্রার শুরুতে কোন বিলম্ব না করা । No delay in voyage) :
যাত্রা শুরু করতে অযৌতিক কোন বিলম্ব করা যাবে না। অহেতুক বিলম্ব হলে বীমাকারী কোন ক্ষতির দায় বহনে অস্বীকার করতে পারেন।
(গ) কোন বিচ্যুতি নয় (Non-deviation) :
পথে অহেতুক ও ইচ্ছাকৃত কোন বিচ্যুতি করা বা সাধারণ পথ পরিহার করে ভিন্ন পথে চলা যাবে না।
তবে, অপরিহার্য জরুরী পরিস্থিতিতে, যেমন – যুদ্ধকালীন অবস্থা এড়াতে, জাহাজকে বাচাতে বা বীমাকারীর ঝুঁকি লাঘরের উদ্দেশ্যে অথবা অন্য কোন বিপত্তি এড়াতে উপরোক্ত উহ্য শর্তাবলীর অনিচ্ছাকৃত বরখেলাপ বীমাকারীকে দায় থেকে অব্যাহতি দিবেনা।
