আর্থিক সংস্কারের অধীনে বাংলাদেশের বীমা খাতের রূপান্তর প্রক্রিয়া

বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের আধুনিকায়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পক্ষ থেকে যে সংস্কার কর্মসূচি ও পথনকশা প্রদান করা হয়েছে, তার প্রভাব এখন বীমা খাতে দৃশ্যমান হচ্ছে। ব্যাংক খাতের সংস্কারের সমান্তরালে দেশের বীমা খাতেও স্বচ্ছতা, দক্ষ গ্রাহক সেবা, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি এবং সময়োপযোগী বিনিয়োগ নীতিমালা প্রণয়নের জন্য ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং জনআস্থার সংকটের মতো বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে নীতিনির্ধারকগণ এখন কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচি ও আর্থিক প্রেক্ষাপট

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বর্ধিত ঋণ সুবিধা, বর্ধিত তহবিল সুবিধা এবং স্থিতিস্থাপকতা ও টেকসই তহবিলের আওতায় বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কার এখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে বিভিন্ন কর্মসূচির পঞ্চম পর্যালোচনা সম্পন্ন করেছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের জুনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বাংলাদেশের জন্য প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বৃহৎ আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। সংস্থাটির ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হলেও আর্থিক খাতের যথাযথ সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশে ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বীমা খাতের বর্তমান চিত্র ও বৈশ্বিক তুলনা

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার অনুযায়ী বীমা খাতের অবদান অত্যন্ত নগণ্য। মোট দেশজ উৎপাদনে বীমা খাতের অবদান বা পেনিট্রেশন রেট মাত্র ০.৩৩ থেকে ০.৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বীমা প্রিমিয়াম সংগৃহীত হয়েছে ১৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। প্রতিবেশী দেশ ও বৈশ্বিক গড় হারের তুলনায় এই অবস্থান অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

নিচে বিভিন্ন দেশের বীমা পেনিট্রেশন হারের একটি তুলনামূলক চিত্র প্রদান করা হলো:

দেশের নামবীমা পেনিট্রেশন হার (শতকরা)তথ্যের সময়কাল
লুক্সেমবার্গ৩৩.০%২০২৪
ওইসিডি ভুক্ত দেশসমূহ (গড়)৬.২%২০২৪
ভারত৩.৭%২০২৪-২৫
ভিয়েতনাম২.৩% – ২.৮%সাম্প্রতিক
বাংলাদেশ০.৩৩% – ০.৪%২০২৪-২৫

দাবি নিষ্পত্তির হার ও গ্রাহক আস্থার সংকট

বাংলাদেশের বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহার প্রধান কারণ হলো দাবি নিষ্পত্তির নিম্ন হার। বর্তমানে এই হার আশঙ্কাজনকভাবে ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বৈশ্বিক মানদণ্ডে দাবি নিষ্পত্তির হার সাধারণত ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশ হয়ে থাকে। ২০২৪ সালে মোট ১৬ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকার বীমা দাবির বিপরীতে কোম্পানিগুলো মাত্র ৯ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। বিশেষ করে জীবন বীমা খাতে এই হার ৭২ শতাংশ থেকে কমে ৬৫ শতাংশে এবং সাধারণ বীমায় ৪১ শতাংশ থেকে কমে ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতির ফলে ২০২৫ সালের শেষার্ধে কিস্তি জমা না দেওয়ার হার বা পলিসি স্থগিতের হার প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যর্থতা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

বীমা খাতের উন্নয়নে ২০১৮ সালে ৯২৫ কোটি টাকার একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল চার বছরে বীমাগ্রহীতার সংখ্যা ১ কোটি ৩৬ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ কোটিতে উন্নীত করা। তবে ২০২৪ সালের শেষে দেখা যায়, গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পরিবর্তে কমে ৮২ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের মেয়াদকালেই বীমা কভারেজ প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

প্রস্তাবিত সংস্কার ও ভবিষ্যতের পথনকশা

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে বীমা খাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রস্তাবনা বর্তমানে গুরুত্ব পাচ্ছে:

  • আইনি সংস্কার: ২০১০ সালের বীমা আইন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আইন সংশোধনের মাধ্যমে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া বা প্রয়োজনে একীভূত করার ক্ষমতা প্রদান করা হবে।

  • মূলধন ও স্বচ্ছলতা নিশ্চিতকরণ: কোম্পানিগুলোর সলভেন্সি মার্জিন বা দাবি পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি ও পর্যাপ্ত মূলধন কাঠামো বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • বিনিয়োগ নীতিমালার আধুনিকায়ন: বর্তমানে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর তহবিলের অন্তত ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক। এই বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে ঝুঁকিভিত্তিক ও বহুমুখী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যাতে তহবিল থেকে অধিক মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয়।

  • ডিজিটালাইজেশন: দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা আনতে কেন্দ্রীয় অনলাইন তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি পরিশোধ বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

  • নতুন পণ্যের উদ্ভাবন: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি বীমা, স্বাস্থ্য বীমা এবং অন্যান্য সুরক্ষা পণ্যের প্রসার ঘটিয়ে গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

২০২৬ সালের মধ্যে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বীমা খাতে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এবং জনআস্থার পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Comment