২০২৫ সালে চীনের বীমা খাত অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে চীনের পাঁচটি প্রধান তালিকাভুক্ত বীমা প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য প্রদর্শন করেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পিং আন ইন্স্যুরেন্স, চায়না লাইফ, পিআইসিসি গ্রুপ, চায়না প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স এবং নিউ চায়না লাইফ—এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে ৪২৫.৩ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৬১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এই মুনাফার পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ২২.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বীমা বাজারের সক্ষমতাকে নির্দেশ করে।
Table of Contents
সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি
চীনের বীমা খাতের এই অগ্রগতির পেছনে দেশটির বিশাল অর্থনৈতিক কাঠামো ও সুষম প্রবৃদ্ধি সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, চীনের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি দাঁড়িয়েছে ১৪০.১৯ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ শতাংশ। এই জিডিপির সিংহভাগ আসে সেবা খাত থেকে, যার মূল্য সংযোজন ছিল প্রায় ৮০.৮৯ ট্রিলিয়ন ইউয়ান। শিল্প খাতের অবদান ছিল ৪৯.৯৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ান এবং কৃষি খাতের অবদান ছিল ৯.৩৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ান। মূলত প্রযুক্তি, রপ্তানি বাজার, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং শক্তিশালী সেবা খাতের ওপর ভিত্তি করে চীনের অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মূল্যায়ন অনুসারে, ২০২৫ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি মূলত শক্তিশালী নিট রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদার আপেক্ষিক দুর্বলতা, আবাসন খাতের মন্দা, যুব বেকারত্ব এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা দেশটির অর্থনীতির জন্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং দ্রুত নগরায়নের ফলে দেশটির মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বীমা পণ্যের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বীমা বাজারের কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানের ধরন
চীনের বীমা বাজার বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, বেসরকারি, যৌথ উদ্যোগ এবং বিদেশি অংশীদারিত্বের সমন্বয়ে একটি বহুমুখী কাঠামোতে রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চায়না লাইফ, পিআইসিসি, চায়না তাইপিং এবং চায়না রি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত জীবন বীমা, পুনর্বীমা এবং বৃহৎ অবকাঠামোগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে, ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ চায়নার ২০২৩ সালের তথ্য অনুসারে, সংস্থাটির সদস্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩৪৭টি। এর বিশদ বিবরণ নিচের তালিকায় প্রদান করা হলো:
| প্রতিষ্ঠানের ধরন | সংখ্যা |
| বীমা গ্রুপ বা হোল্ডিং কোম্পানি | ১৩ |
| অ-জীবন বীমা বা সম্পদ বীমা কোম্পানি | ৮৬ |
| জীবন বীমা কোম্পানি | ৯৩ |
| অন্যান্য সদস্য প্রতিষ্ঠান | ১৫৫ |
| মোট সদস্য প্রতিষ্ঠান | ৩৪৭ |
আয়ের উৎস ও বিনিয়োগ কৌশল
চীনা বীমা কোম্পানিগুলোর আয়ের প্রধান উৎস হলো গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রিমিয়াম এবং অর্জিত তহবিলের কৌশলগত বিনিয়োগ। জীবন বীমা কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, স্বাস্থ্য বীমা, পেনশন এবং অ্যানুইটি থেকে আয় করে। অন্যদিকে, অ-জীবন বীমা কোম্পানিগুলো মোটর যান, কৃষি, বাণিজ্যিক ঝুঁকি এবং অবকাঠামো প্রকল্পের সুরক্ষা প্রদান করে আয় নিশ্চিত করে।
২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, চীনের বীমা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১.৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা আগের বছরের চেয়ে ১৫.১ শতাংশ বেশি। বীমা কোম্পানিগুলো তাদের তহবিলের একটি বড় অংশ সরকারি বন্ড, করপোরেট বন্ড, ব্যাংক আমানত এবং শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে থাকে। ২০২৬ সালের মার্চের তথ্যমতে, তাদের ইক্যুইটি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৫.৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা মোট ব্যবহৃত তহবিলের ১৫.৩৮ শতাংশ।
শীর্ষ পাঁচটি বীমা প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষমতা (২০২৫)
চীনের শীর্ষস্থানীয় বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পৃথক শাখায় রেকর্ড পরিমাণ প্রিমিয়াম আয় ও মুনাফা অর্জন করেছে। প্রধান পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষমতা নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| প্রতিষ্ঠানের নাম | প্রাক্কলিত প্রিমিয়াম আয় (ইউয়ান) | নিট মুনাফা (ইউয়ান) | বিশেষত্ব |
| পিং আন ইন্স্যুরেন্স | ৩৪৩.২ বিলিয়ন (সম্পদ ও দুর্ঘটনা) | – | ফিনটেক ও স্বাস্থ্যসেবা মডেল |
| চায়না লাইফ | ৭২৯.৮৯ বিলিয়ন (মোট) | ১৫৪ বিলিয়ন | দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও পেনশন |
| পিআইসিসি গ্রুপ | ৫৫০ বিলিয়ন (সম্পদ ও দুর্ঘটনা) | – | কৃষি ও সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প |
| চায়না প্যাসিফিক | ২৫৮.১ বিলিয়ন (জীবন বীমা) | ৫৩.৫ বিলিয়ন | ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ও অ-জীবন বীমা |
| নিউ চায়না লাইফ | ১৯৫.৮৭ বিলিয়ন (মোট) | ৩৬.২ বিলিয়ন | চিকিৎসা ও অবসরভিত্তিক পণ্য |
বিদেশি অংশগ্রহণ ও আন্তর্জাতিক তদারকি
চীনের বীমা বাজার ধীরে ধীরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে। বিএনপি প্যারিবাস, প্রুডেনশিয়াল ফাইন্যান্সিয়াল, এআইএ, এবং অ্যালিয়াঞ্জের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন চীনের বাজারে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ২০২৪ সালে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিদেশি কিছু প্রতিষ্ঠানকে নতুন সম্পদ ব্যবস্থাপনা উদ্যোগের অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়াও বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক বীমা তদারকি সংস্থা (আইএআইএস) চীনের বাজার উন্নয়ন, জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রিন ফাইন্যান্সের মতো বিষয়ে নীতিগত ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে।
পরিশেষে, চীনের বীমা খাত এখন কেবল একটি আর্থিক সুরক্ষার মাধ্যম নয়, বরং এটি দেশটির সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। যদিও বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যার চাপ, স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং বাজার অস্থিরতার মতো ঝুঁকি বিদ্যমান, তবুও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সরকারি নীতিগত সহায়তায় এই খাতটি চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অগ্রভাগে অবস্থান করছে। নতুন ডিজিটাল সেবা এবং বীমা-সেবা মডেলের সংযোজন এই খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
