দেশের বিমা খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও করপোরেট সুশাসন ভেঙে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ (আইডিআরএ)-এর একটি আইনি নির্দেশনার বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদের কোনো প্রকার অনুমোদন বা আলোচনা ছাড়াই উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান তাহমিনা আফরোজ। বিমা আইনের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার একক অপব্যবহারের এই ঘটনাটি বর্তমানে বিমা খাতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
Table of Contents
পর্ষদকে অন্ধকারে রেখে আইনি পদক্ষেপ
তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য অভিযোগ করেছেন যে, চেয়ারম্যান তাহমিনা আফরোজ পর্ষদের সদস্যদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এবং কোনো বোর্ড সভা আহ্বান না করেই একক সিদ্ধান্তে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন। এই বিষয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আইডিআরএ চেয়ারম্যানের কাছে তিন পরিচালক—মো. আবুল হাসেম, মো. হুমায়ুন কবির পাটওয়ারী এবং মো. আবুল হাসেম একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
অভিযোগপত্র থেকে জানা গেছে, রিট পিটিশন নম্বর-২৮৬/২০২৬ দায়ের করার জন্য প্রয়োজনীয় ‘অথরাইজেশন লেটার’ বা ক্ষমতা প্রদানপত্র চেয়ারম্যান একক সিদ্ধান্তে ইস্যু করেছেন। বিমা আইন ও করপোরেট প্রবিধান অনুযায়ী, কোম্পানির নামে যেকোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পরিচালনা পর্ষদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি এবং অধিকাংশ পরিচালক এই বিষয়ে অবগত ছিলেন না। রিট আবেদনে বোর্ড অনুমোদনের কথা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রমাণ বা রেজোলিউশন নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচনী কারচুপি ও আইডিআরএ-এর তদন্ত প্রতিবেদন
এই সংকটের মূল সূত্রপাত হয় কোম্পানির ২৫তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) অনুষ্ঠিত পরিচালক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ওই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠায় আইডিআরএ বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেয় খ্যাতনামা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মাহফিল হক অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস’-কে। তদন্ত প্রতিবেদনে ভোট গণনায় জালিয়াতি ও পদ্ধতিগত অনিয়মের অকাট্য প্রমাণ মেলে।
তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গত ৮ ডিসেম্বর আইডিআরএ একটি চূড়ান্ত আদেশ জারি করে। ওই আদেশে বলা হয় যে, অনিয়মের মাধ্যমে বিজয় লাভ করা পাঁচ পরিচালক—এ বি এম কায়কোবাদ, মো. মাসুদুর রহমান, তাহমিনা আফরোজ, জিয়াউদ্দিন পোদ্দার ও মো. সাইফুল ইসলাম—তাঁদের পদের বৈধতা হারিয়েছেন। এর পরিবর্তে নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে বিজয়ী হওয়া পাঁচজন প্রতিনিধি—মো. মফিজ উদ্দিন, ফারজানা রহমান, আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, নাফিসা সালমা ও মো. ওসমান গণি—কে যথাযথ দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। চেয়ারম্যান মূলত নিজের ও সহযোগীদের পদ রক্ষা করতেই তড়িঘড়ি করে পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
পর্ষদে একক প্রভাব ও প্রশাসনিক অসহযোগিতা
অভিযোগকারী পরিচালকদের মতে, তাহমিনা আফরোজ তাঁর ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রায় ৯ জন প্রতিনিধিকে কৌশলে পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই গাণিতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি কোম্পানির নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিঠি ও দাপ্তরিক নথিপত্র বোর্ড সভায় উপস্থাপন না করে গোপন রাখা হচ্ছে।
পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির পাটওয়ারী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পরিচালক নির্বাচন সংক্রান্ত আইনজীবীদের মতামত এবং আইডিআরএ-এর প্রেরিত অত্যন্ত জরুরি চিঠিপত্রও তাঁদের দেখানো হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন যে, কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং কোম্পানি সচিব সরাসরি চেয়ারম্যানকে এই তথ্য গোপনের কাজে সহায়তা করছেন, যা করপোরেট নৈতিকতার পরিপন্থী।
আমানতকারীদের নিরাপত্তা ও বিমা খাতের ওপর প্রভাব
একটি বিমা কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিতকে নড়বড়ে করে দেয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে বর্তমানে যে প্রশাসনিক অরাজকতা চলছে, তাতে সাধারণ গ্রাহকদের কষ্টার্জিত আমানত ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে। করপোরেট সুশাসনের এই অভাব বিমা খাতের ওপর গ্রাহকদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিমা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন, তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের এই ঘটনাটি বিমা আইনের কার্যকারিতা প্রমাণের একটি বড় ক্ষেত্র। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ-এর তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ার পরও আইনি মারপ্যাঁচে তা আটকে রাখার চেষ্টা প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করছে। বিমা খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবিলম্বে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও চেয়ারম্যানের নিরবতা
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান তাহমিনা আফরোজের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে এবং লিখিত বার্তারও কোনো উত্তর মেলেনি। বর্তমানে রিট মামলাটি উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে থাকলেও কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। পরিচালকদের দাবি, আইডিআরএ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কঠোর তদারকি ছাড়া এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। বিমা খাতের ভাবমূর্তি রক্ষায় একটি স্বচ্ছ ও যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো ফিরিয়ে আনাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
