নবায়ন ফি পরিশোধের পরও বিমা লাইসেন্স প্রাপ্তিতে জটিলতা

বাংলাদেশের বিমা খাতে বর্তমানে এক গভীর প্রশাসনিক ও আইনি সংকট তৈরি হয়েছে। দেশের অধিকাংশ বিমা কোম্পানি আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিবন্ধন নবায়ন ফি জমা দিলেও ২০২৫ সালের জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স এখনো হাতে পায়নি। ‘বীমা আইন, ২০১০’ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করেও লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা, নথিপত্র হালনাগাদ এবং নতুন বিমা পলিসি বাজারজাতকরণে চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি নিরসনে বিমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

আইনি বাধ্যবাধকতা ও বর্তমান সংকট

বিমা আইন, ২০১০-এর ১১(২) ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি বিমা কোম্পানিকে প্রতি বছর ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পরবর্তী বছরের জন্য নিবন্ধন নবায়ন ফি সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। ২০২৫ সালের লাইসেন্স প্রাপ্তির লক্ষ্যে অধিকাংশ কোম্পানি গত ৩০ নভেম্বর ২০২৪-এর মধ্যেই নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করে আবেদন সম্পন্ন করেছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ফি জমা দেওয়ার পর জানুয়ারি মাসের মধ্যেই লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মে মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও অনেক প্রতিষ্ঠান তা বুঝে পায়নি।

এরই মধ্যে ২০২৬ সালের নবায়ন প্রক্রিয়ার সময়সীমা সন্নিকটে চলে আসায় বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তীব্রতর হচ্ছে। বিআইএ-এর তথ্যমতে, গত ২৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সংগঠনের ২২৭তম নির্বাহী কমিটির সভায় কোম্পানি মালিকরা এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, আইন মেনে যথাসময়ে অর্থ পরিশোধের পরও লাইসেন্স না পাওয়া কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি সামগ্রিক বিমা খাতের ওপর গ্রাহকদের আস্থার সংকটকেও ঘনীভূত করতে পারে।

ফি কাঠামোর পরিবর্তন ও প্রজ্ঞাপন বিতর্ক

বিমা খাতের বর্তমান অস্থিরতার মূলে রয়েছে ‘বিমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২’-এর একটি বিতর্কিত সংশোধনী। পূর্বে বিমা কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে ১ টাকা হারে নবায়ন ফি প্রদান করতে হতো। তবে সরকার সম্প্রতি একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যেখানে এই ফি-এর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী:

  • ২০২৬-২০২৮ সাল পর্যন্ত: প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে নবায়ন ফি ১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

  • পরবর্তী ধাপ: এই হার পর্যায়ক্রমে ৫ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিমা সংশ্লিষ্টদের মূল অভিযোগ হলো, অনেক কোম্পানি যখন ২০২৪ সালের নভেম্বরে তৎকালীন প্রচলিত হারে (১ টাকা) ফি জমা দিয়ে আবেদন সম্পন্ন করেছে, তার ঠিক পরেই অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন গেজেট প্রকাশ করে বর্ধিত ফি কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা পূর্ববর্তী আবেদনগুলোর বিপরীতেও নতুন হারের বর্ধিত ফি দাবি করছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার জমাকৃত ফি-র ওপর পরবর্তী কোনো আইন বা প্রজ্ঞাপন পেছন থেকে (Retrospective effect) কার্যকর করে বাড়তি অর্থ আদায়ের আইনি ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল।

বিআইএ-এর দাবি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ

উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে বিআইএ-এর প্রেসিডেন্ট সাঈদ আহমেদ আইডিআরএ-এর চেয়ারম্যান বরাবর একটি আনুষ্ঠানিক পত্র প্রেরণ করেছেন। চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যারা গত ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তৎকালীন প্রচলিত আইন অনুযায়ী ফি জমা দিয়েছে, তাদের লাইসেন্স অবিলম্বে নবায়ন করতে হবে। যদি বর্ধিত ফি নিয়ে কোনো আইনি অস্পষ্টতা থাকে, তবে প্রয়োজন সাপেক্ষে সরকারি গেজেট সংশোধন করার জন্য তিনি সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন।

বিআইএ আরও জানিয়েছে যে, গত ১ মার্চ আইডিআরএ-এর তৎকালীন চেয়ারম্যানের সঙ্গে এক বৈঠকে বর্ধিত ফি ছাড়াই লাইসেন্স নবায়নের ইতিবাচক আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই আশ্বাসের কোনো প্রতিফলন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। জেনিথ ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এস এম নূরুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা নভেম্বরেই বৈধভাবে আবেদন করেছি, কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে হুট করে ফি বাড়ানো হয়েছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত ফি প্রদান করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।”

নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

বর্তমানে আইডিআরএ-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ৬৭টি বিমা প্রতিষ্ঠান সংশোধিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নতুন হারে ফি পরিশোধ করতে না পারায় তাদের নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ঝুলে আছে। আইডিআরএ-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ফজলুল হক জানিয়েছেন যে, নিয়ম অনুযায়ী আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বিআইএ-এর আবেদন আমলে নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিমা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিমা কোম্পানিগুলোর আন্তর্জাতিক নথিপত্র হালনাগাদ এবং পুনঃবিমা (Reinsurance) চুক্তির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিমা খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় দ্রুত লাইসেন্স নবায়ন এবং ফি কাঠামো সংক্রান্ত অস্পষ্টতা দূর করা এখন সময়ের দাবি। লাইসেন্স নবায়ন না হলে অনেক কোম্পানি আইনিভাবে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় বাধার সম্মুখীন হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিমা মালিকদের দাবি, একটি উদীয়মান খাতের বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে এ ধরণের প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন।

Leave a Comment