বিমা চুক্তি ভাঙলেও দুর্ঘটনায় আহতকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ

সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়, পথ দুর্ঘটনা মামলায় নতুন দিশা

ভারতে পথ দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আইনি জটিলতায় এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল দেশের শীর্ষ আদালত। সাম্প্রতিক এক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—বিমা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘিত হলেও, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া থেকে বিমা সংস্থা দায় এড়াতে পারে না। তেলঙ্গানা হাই কোর্টের একটি বিতর্কিত রায় খারিজ করে এই নির্দেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।

বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মোটরযান আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো দুর্ঘটনার শিকার নিরীহ মানুষকে দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। বিমা সংস্থা ও গাড়ির মালিকের মধ্যকার চুক্তিগত শর্তের কারণে যেন দুর্ঘটনাগ্রস্ত ব্যক্তি বঞ্চিত না হন—এই নীতিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে আদালত।

এই মামলার সূত্রপাত আকুল নারায়ণ নামে এক ব্যক্তির আবেদনের মাধ্যমে। তিনি একটি পাঁচ আসনবিশিষ্ট গাড়িতে যাত্রাকালে এক মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনার শিকার হন। দুর্ঘটনার পর মোটর অ্যাক্সিডেন্টস ক্লেমস ট্রাইব্যুনাল (MACT) রায় দেয় যে, গাড়ির মালিক ও সংশ্লিষ্ট বিমা সংস্থা যৌথভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য।

তবে বিষয়টি ঘুরপাক খায়, যখন তেলঙ্গানা হাই কোর্ট ওই নির্দেশ খারিজ করে দেয়। হাই কোর্টের যুক্তি ছিল, পাঁচ আসনের একটি গাড়িতে চালক নয়জন যাত্রী বহন করছিলেন, যা স্পষ্টতই বিমা চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন। এই কারণ দেখিয়ে বিমা সংস্থাকে ক্ষতিপূরণের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন আকুল নারায়ণ। শীর্ষ আদালত হাই কোর্টের যুক্তিকে গ্রহণ না করে জানায়, বিমা চুক্তি ভঙ্গের দায় মূলত গাড়ির মালিকের। কিন্তু সেই দায়ের বোঝা কোনোভাবেই দুর্ঘটনাগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর চাপানো যায় না। ফলে প্রথমে বিমা সংস্থাকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে ন্যায়বিচারের ভারসাম্য রক্ষার্থে আদালত এটাও স্পষ্ট করেছে যে, বিমা সংস্থা পরে আইনগত প্রক্রিয়ায় গাড়ির মালিকের কাছ থেকে সেই অর্থ পুনরুদ্ধার করতে পারবে।

রায়ে সুপ্রিম কোর্ট পূর্ববর্তী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলার নজির উল্লেখ করেছে, যেখানে একই ধরনের পরিস্থিতিতে ‘পে অ্যান্ড রিকভার’ (Pay and Recover) নীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল। এই নীতি অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যেন দ্রুত ক্ষতিপূরণ পান, সেটাই প্রথম লক্ষ্য; চুক্তিগত বিরোধ পরে মেটানো যাবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে পথ দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অসংখ্য মামলায় দিশা দেখাবে এবং বিমা সংস্থাগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও আরও সুস্পষ্ট করবে।

মামলার সংক্ষিপ্ত তথ্য (টেবিল)

বিষয়বিবরণ
মামলার আবেদনকারীআকুল নারায়ণ
আদালতভারতের সুপ্রিম কোর্ট
বেঞ্চবিচারপতি সঞ্জয় করোল ও বিচারপতি মনোজ মিশ্র
মূল প্রশ্নবিমা চুক্তি লঙ্ঘন হলে ক্ষতিপূরণের দায় কার
হাই কোর্টের রায়বিমা সংস্থার দায় নেই
সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তবিমা সংস্থা ক্ষতিপূরণ দেবে, পরে মালিকের কাছ থেকে আদায় করতে পারবে
নীতিPay and Recover

এই রায়ের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো—আইনের চোখে মানবিকতা ও সামাজিক সুরক্ষাই সর্বাগ্রে।

Leave a Comment