সিঙ্গেল মায়েদের আর্থিক সুরক্ষা: বীমা সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে একক মায়েদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা তাদের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে। সীমিত আয়ের মধ্যে সন্তান পালন ও পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব একাই বহন করতে হয় এই নারীদের। এই প্রেক্ষাপটে সঞ্চয় ও জীবনবীমা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং একটি কার্যকর আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে জীবনবীমার অনুপ্রবেশ মাত্র ০.৪০% থেকে ০.৫০% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা আঞ্চলিক তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বীমা প্রতিষ্ঠান নারী-কেন্দ্রিক পলিসি চালু করেছে, যা সিঙ্গেল মাদারদের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

নিম্নের টেবিলে কয়েকটি নারী-কেন্দ্রিক বীমা পলিসির মূল তথ্য দেখানো হলো:

প্রতিষ্ঠানপলিসি নামমাসিক প্রিমিয়ামসুরক্ষা কভারেজবিশেষ সুবিধা
গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সইজিল্যাইফ জায়া৩৫০ টাকা৫ লাখ টাকাস্বাস্থ্য সুরক্ষা, গুরুতর রোগ কভারেজ
গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সনিবেদিতা৫৮০ টাকা (বার্ষিক)১–১০ লাখ টাকাদুর্ঘটনা, ট্রমা, এসিড আক্রমণ, ধর্ষণ, ডাকাতি কভারেজ
মেটলাইফ বাংলাদেশএডুকেশন প্রোটেকশন প্ল্যানপরিবর্তনশীলসন্তানের শিক্ষার জন্য মাসিক ভাতামায়ের মৃত্যু হলে ভবিষ্যতের প্রিমিয়াম মওকুফ, শিক্ষা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা

এই ধরনের পলিসি সিঙ্গেল মাদারদের জন্য একাধিক স্তরে সুরক্ষা প্রদান করে। মায়ের অনুপস্থিতিতেও সন্তানের শিক্ষা চালু রাখা সম্ভব, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা যায় এবং নিয়মিত প্রিমিয়ামের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ২৬% পরিবার জটিল রোগের চিকিৎসার কারণে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়। এছাড়া, দেশের ২৬% ব্যবসার মালিক নারী, যারা বার্ধক্যকালীন আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সঞ্চয়ভিত্তিক বীমার ওপর নির্ভরশীল।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ২০২৪ সালে জীবনবীমার গড় দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল ৬৬.০৩%, যা পূর্ব বছরের তুলনায় কম। মুদ্রাস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমিয়ে দিতে পারে। গ্রামীণ অঞ্চলে বীমা সেবার প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায় অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সুরক্ষার পথে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারী-কেন্দ্রিক বীমার সুফল বাড়াতে সচেতনতা বৃদ্ধি, সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং দাবি নিষ্পত্তির স্বচ্ছতা অপরিহার্য। সরকারি পর্যায়ে, ২০২৬ সালের মধ্যে বার্ষিক ৬০–১,০১৫ টাকা প্রিমিয়ামের মধ্যে মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা বীমা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যার আওতায় সর্বোচ্চ ৪১,০০০ টাকা পর্যন্ত কভারেজ দেওয়া হবে। এটি নিম্নআয়ের নারীদের জন্য একটি প্রাথমিক আর্থিক সুরক্ষা নেট তৈরিতে সহায়ক হবে।

সিঙ্গেল মাদারদের জন্য বীমা কেবল আর্থিক নিরাপত্তা নয়, এটি স্বাধীনতার প্রতীক ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠছে। তবে এর বাস্তব সুফল পেতে হলে প্রিমিয়াম সহজলভ্য ও দাবি নিষ্পত্তি স্বচ্ছ হওয়া অত্যাবশ্যক।

Leave a Comment