আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বিনিয়োগের নীতিমালা যা জীবন বীমা অধ্যায়ের অর্ন্তভুক্ত।
বিনিয়োগের নীতিমালা

ক্রমাগত অনুশীলন, অনুসরণ এবং বিভিন্ন লেখক ও বিশেষজ্ঞ অভিমত অনুযায়ী কালক্রমে বিনিয়োগের যেসব নীতিমালা সাধারণগ্রাহ্য হয়েছে নিম্নে সেগুলি সম্পর্কে কিছুটা বর্ণনা প্রদান করা হলোঃ –
১. নিরাপত্তা (Safety) : তহবিল বিনিয়োগের অন্যতম অনুসৃত নীতি হচ্ছে বিনিয়োগকৃত অর্থের নিরাপত্তা। মুনাফা অর্জনের জন্যে বিনিয়োগ অপরিহার্য বটে, কিন্তু, তাই বলে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের আশায় এমন খাতে এমন ক্ষেত্রে – বিনিয়োগ করা আদৌ সমীচীন নয় যেখানে বিনিয়োগকৃত অর্থের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়ে পড়বে। একারণেই ফটকা বা অতিরিক্ত দূরকল্পনামূলক বিনিয়োগ (Speculative Investment) জীবন বীমার জন্যে উপযোগী নয়।
কেননা, তাতে উচ্চ মুনাফার যেমন সম্ভাবনা থাকে, সর্বাধিক ক্ষতির সম্ভাবনাও তেমনি বিদ্যমান থাকে। আর, তাই, বিনিয়োগ করা উচিত নিরাপদ ক্ষেত্রে। [কেননা, তাতেই তহবিলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে। তহবিল নিরাপদ না থাকলে সে বিনিয়োগের কোন অর্থ নেই। তাইতো নিরাপত্তা বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান নীতি।
২. মুনাফাজনকতা (Profitability) : মুনাফাজনকতা বিনিয়োগের আর একটি প্রধান নীতি। মু নাফাজনকতা কেননা, মুনাফাই যদি না হলো-তাহলে বিনিয়োগেরই ি প্রয়োজন, আর কারবারেরই কি অর্থ।তাই,বীমাকারীকে এমন খাতে তহবিল বিনিয়োগ করতে হবে যাতে অধিক সুদ প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু, তাতেতো আবার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
কেননা, বাস্তব সত্য হলো এই যে – নিরাপদ বিনিয়োগ ক্ষেত্র থেকে সুদ প্রাপ্তির হার থাকে কম। তবে, এমন কিছু কিছু ঋণপত্র বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায় সব দেশেই থাকে যেখানে মুনাফা বা সুদও যেমন প্রত্যাশিত মাত্রায় পাওয়া যায়, তেমনি বিনিয়োগেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। তাই, একাধারে মুনাফাজনকতা ও নিরাপত্তা সংহত করতে ঐসব ক্ষেত্রকেই বেছে নেয়া উচিত।
৩. তারল্য বা তরলতা (Liquidity) : বিনিয়োগকে অতি সহজে এবং মূলধনের অনাকাঙ্খিত কোন ক্ষতি না করেই দ্রুত ব্যবহারের লক্ষ্যে ভাঙ্গানো বা রূপাস্তর অথবা বদলযোগ্যতাকেই বিনিয়োগের তারল্য বলা হয়। বীমাপ্রতিষ্ঠানেরও বীমাদাবী পূরণ সহ দৈনন্দিন কিছু কারবারী তথা আর্থিক কাজ কর্ম চালিয়ে যেতে হয় যার জন্যে প্রয়োজন তহবিল সংরক্ষণের। কিন্তু, তাই বলেতো সংগ্রহীত অর্থ প্রতিষ্ঠানে অলসভাবে বসিয়ে রাখা সঙ্গত নয়।
তাই, এমনসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা উচিত যেখানকার বিনিয়োগের মাধ্যমকে অতিসহজে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় বদল বা` রূপান্তর করা যায়। এ নীতিটি এক সময় খুব গুরুত্বসহকারে অনুসৃত হতো। কেননা, গ্রাহককে দ্রুত অর্থপ্রদান এবং যথাসময়ে ব্যয় নির্বাহের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কর্ম।
সম্পাদনের যোগ্যতার উপরই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ও সুনাম অনেকটা নির্ভর করত। কিন্তু, বর্তমান সময়ে অবস্থার বেশ কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। কেননা, আজকাল, বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দৈনন্দিন যে অর্থাগম হয় তা দিয়ে ঐ প্রয়োজন অনেকটা মিটানো সম্ভবপর হয়। তদুপরি, তারল্যের নীতির কঠোর অনুসরণে প্রতিষ্ঠানে অর্থ অলসভাবে বসিয়ে রাখা মুনাফাজনকতাকে বিঘ্নিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এ ছাড়া, বীমাকারী দাবী পরিশোধে কিছুটা কৌশলে বিলম্ব ধারার (Clause of delay) প্রয়োগ করতে পারেন। তাই, তারল্যের নীতিটির গুরুত্ব যেন কিছুটা হালকা হচ্ছে। কিন্তু, এতদসত্ত্বেও তারল্যের নীতি হয়ত কোনদিনই তার সম্পূর্ণ তাগিদ হারাবে না। কারণ, সবকালে সবক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা কমবেশী থেকেই যায়।
৪. বহুধা প্রবহমানতা (Diversification) : বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রেক্ষিত বিবেচনায় বিনিয়োগের নিরাপত্তা, মুনাফাযোগ্যতা ও তারল্যের কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন খাত ও ক্ষেত্রে তহবিল বিনিয়োগের নীতিই হচ্ছে বহুধা প্রবহমানতা বা বিনিয়োগকারিতা (Diversification)। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ নীতি। অর্থাৎ, বীমাকারীগণ তাদের তহবিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার নীতি অনুসরণ করেন।
কেননা, কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন মাধ্যম হঠাৎ কোন কারণে লোকসানের শিকার হয়ে পড়তে পারে – এমনকি, কোন প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তা হতে পারে। আবার, একই সময় অন্য একটি প্রতিষ্ঠান খুব লাভজনক হয়ে পড়তে পারে। এরূপ বিষয়সমূহ বিবেচনা করেই বলা হয়েছে – “Do not invest all the funds at one Place, in an industry, in a security and for a pelod of maturity.
(ক) একস্থানে, (খ) একশিল্প প্রতিষ্ঠানে, (গ) এক ঋণপত্রে এবং (ঘ) এক মেয়াদে বিনিয়োগ করা উচিৎ নয়। কেননা, তাতে সম্পূর্ণ তহবিলই খোয়া যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন মাধ্যমে, বিভিন্ন মেয়াদে এবং বিভিন্ন সময়ে তহবিল বিনিয়োগ করা বিনিয়োগের নিরাপত্তাকেই নিশ্চিত করে ।
৫. জীবন বীমা কারবারের পরিবৃদ্ধি সাধন (Increasing of Life Business):এ নীতির মূল কথা হলো-বিনিয়োগ করা উচিত সেই সব ক্ষেত্রে যে সব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করলে ফলশ্রুতিতে জীবন বীমারই সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হতে পারে। যেমন : গৃহনির্মান প্রকল্প, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করলে, ঐ ক্ষেত্রগুলো সম্প্রসারিত ও উন্নত হয় যার ফলে জীবন বীমার প্রবাহক্ষেত্র সম্প্রসারিত হতে পারে। আর, এর ফলে শুধুই জীবন বীমার উন্নতি নয় সমাজ ও জাতীয় উন্নতি ত্বরান্বিত হতে পারে।

