ব্যক্তি ও পরিবার জীবনে জীবন বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব

ব্যক্তি ও পরিবার জীবনে জীবন বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “জীবন বীমা” অধ্যায়ের একটি পাঠ। মানুষ পৃথিবীতে এসে বুদ্ধি আর উপলব্ধির উন্মেষে বুঝতে পারে যে— ক্রমান্বয়ে সে অভাব, সমস্যা, যন্ত্রণা, দুঃখ-বেদনা, জরা-ব্যাধি ও মৃত্যুর দীর্ঘ এক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এ উপলব্ধির উন্মেষের সাথে সাথে শুরু হয় সে শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা। এ চেষ্টারই একটি শুভ ও সফল পরিণতি হলো জীবন বীমার উদ্ভব।

আর, জীবন বীমার উদ্ভব লাভের পর থেকে তার অব্যাহত ধারা বয়ে চলে ক্রমাগতভাবে মানুষের জীবন-জীবিকার সেইসব নহর ও খাদে যেখানে পড়ে মানুষ হাবুডুবু খায় – – বিপন্ন অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার একান্ত প্রচেষ্টায়। মানুষকে এসব দুঃখ-দারিদ্র্য, অভাব-অনটন এবং বিপদ-আপদে উপশম ও অব্যাহতি দিতে জীবন বীমা আজ তার ভূমিকা ও প্রশান্তির ছায়া বিস্তার করে চলেছে এস্তার। শুধু কি ব্যক্তির জীবনে – বৃহত্তর সামষ্টিক তথা জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রেও – জীবন বীমার ভূমিকা কম নয়; বরং, জীবন বীমাই সর্বাধিক জনপ্রিয়তা ও বিস্তৃতি লাভ করেছে পৃথিবীব্যাপী।

ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত তথা সমাজ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথা আর্থ-সামাজিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনে জীবন বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব নিম্নে বর্ণিত হলো : –

ব্যক্তি ও পরিবার জীবনে জীবন বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব

 

ব্যক্তি ও পরিবার জীবনে জীবন বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব | জীবন বীমা | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

ক. ব্যক্তি ও পরিবার জীবনে জীবন বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব:

  • Role & Importance of Life Insurance in the individual and family life

১। মৃত্যুজনিত ক্ষতি ও দুঃখ-দুর্দশা লাঘব বা দূরীকরণ :

জীবনের প্রধানতম শত্রু মৃত্যু। মৃত্যু জীবনকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। যে মানুষটির রোজগারে পরিবারটি চলছিল অকস্মাৎ, মৃত্যু এসে যদি সে মানুষটির জীবন কেড়ে নিয়ে যায়, তাহলে সমস্ত পরবারটি এক গভীর অনিশ্চয়তায় নিপতিত হয় – থেমে যেতে চায় জীবনের চাকা। সামাজিকতা লৌকিকতাতো দূরের কথা সন্তানদের লেখাপড়া, জীবনে প্রতিষ্ঠা, বিবাহ –এমনকি, চিকিৎসা ও প্রাত্যহিক জীবন যাপন হয়ে পড়ে দুঃসাধ্য; দারিদ্র্য আর দুঃখ-যন্ত্রণা জীবনকে করে দুর্বিষহ। এ সবের বিরুদ্ধে যদি জীবন বীমাপত্র ক্রয় করা থাকে তাহলে ব্যক্তির অভাব পুরণ সম্পূর্ণ সম্ভব না হলেও অন্যান্য সমস্যা ও অসুবিধা কাটিয়ে ওঠা সম্ভবপর হয়।

 

২। চাকরী বা কর্মক্ষমতা হারানো অথবা রোগ-ব্যাধির কারণে উপার্জন বন্ধজনিত দুঃখ-দুর্দশার উপশম ও দূরীকরণ :

কোন কারণে রোজগারের উপায়স—চাকরী হারিয়ে অথবা কোন দুর্ঘটনা বা মারত্মক ব্যাধিতে চিরতরে কর্মক্ষমতা হারিয়ে — কোন উপার্জনকারী মানুষ তার রিবার পরিজনদের নিয়ে নিদারুণ দুঃখ-কষ্টের আবর্তে নিপতিত হতে পারে। এমনকি, দুর্ঘটনা ও অসুখ-বিসুখের কারণে কোন মানুষ স্বজনদের নিয়ে সাময়িকভাবে অনেক অসুবিধা ও সমস্যায় সম্মুখীণ হতে পারে। এসব পরিস্থিতিতে জীবন বীমাপত্র নেয়া থাকলে দুঃসময়কাটিয়ে ওঠা সহজতর হয়।

 

৩। বৃদ্ধ বয়সের সহায় :

ভাবনাহীণ শৈশব, চঞ্চলতা ও উদ্দীপনার কৈশোর এবং উচ্ছলতা ও উদ্দামতার যৌবন পেরিয়ে মানুষ প্রগাঢ় কর্ম জীবনে প্রবেশ করে তথ্য কঠিনতর জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। সংসার সমরাঙ্গণে যুদ্ধ করে করে শ্রান্ত হয়ে সে ক্লান্তিময় বার্দ্ধক্যে উপনীত হয়। বার্দ্ধক্যে এসে কেউবা অহেতুক কৃপণ — আবার, কেউবা দারুণ বেহিসেবী হয়ে পড়েন। তাই, বীমা প্রতিষ্ঠানের সাথে বৃত্তিচুক্তি করে নিলে চুক্তিমত বৃত্তিপ্রদান করে বৃদ্ধাবস্থার বোঝা বয়ে নিতে তথা শেষাবধি সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন বীমাকারী।

 

৪। অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া সম্পন্ন করতে ও দেনা পরিশোধে সহায়তা করে :

মানুষ অনেক সময় পরিবার পরিজনরে জন্যে তেমন কিছু না রেখেই পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করে। তখন হয়ত তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্নকরার জন্যেই থাকে না কোন সম্বল; উপরন্ত হয়ত রেখে যান ধার দেনার বোঝা। এমতবস্থায়, একটি জীবন-বীমাপত্র ক্রয় করা থাকলে তা অসহায় পরিবার-পরিজনদের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে অপরিসীম সহায়ক হতে পারে।

 

৫। প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা বিধান করে :

মানুষ যেহেতু অকাল মৃত্যু, ব্যাধি আর বিপদ-আপরে এক অবিরাম হুমকির মুখে থাকে, এগুলো মোকাবেলা করে টিকে থাকতে এবল এগিয়ে যেতে অনেক সময়ই তার স্বীয় শক্তিতে সংকুলান নাও হতেপারে। তখন প্রয়োজন হয় তাকে অর্থ এবং উপদেয়-পরামর্শ দানের। আধুনিক বীমা ব্যবস্থার অধীন একটি জীবন-বীমা গ্রহণ করা থাকলে বীমাকারী তার পাশে এসে দাঁড়ান অর্থও উপদেশ-পরামর্শ দানের অঙ্গীকারে।

 

৬। জীবন-বীমা মানুষকে সঞ্চয়ী ও বিনিয়োগমুখী করে তোলে :

জীবন-বীমাপত্র ক্রয় করা থাকলে বীমাগ্রহীতাকে নিয়ত সচেষ্ট থাকতে হয় বীমাপত্রটিকে চালু রাখতে। ফলে, তাকে সঞ্চয়ী হতে হয় অনেকটা বাধ্য হয়ে। তাছাড়া বীমাকারী ও বীমা প্রতিনিধিষণ মানুষকে প্রচারণার মাধ্যমে সফটী হতে উদ্বুদ্ধ করেন। সঞ্চয়কৃত অর্থ দিয়ে বীমাপত্র ক্রয় করে তা চালিয়ে গেলে তাতে সুদযুক্ত হয়ে বীমাদারীতে পরিণত হয় যা প্রকারান্তরে বিনিয়োগ সৃষ্টি করে।

 

ব্যক্তি ও পরিবার জীবনে জীবন বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব | জীবন বীমা | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

৭। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সাফল্য, সমৃদ্ধি ও উন্নতি ত্বরান্বিত করে :

জীবন-বীমাপত্র ক্রয় করা থাকলে বীমাতা বীমাকারীর কাছ থেকে বীমাদাবী পান। এই বীমাদাবী দিয়ে বীমাগ্রহীতা সাময়িক অভাব-অনটন মিটাতে পারেন, প্রয়োজনমত তা ব্যবহার করে উন্নতি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে কোন কাজ করতে পারেন, বন্ধকী সম্পত্তি ফিরিয়ে আনতে পারেন এবং নিজকে ও পরিবারের সবাইকে দুশ্চিস্তাহীন, কর্মোদ্যোগী, সক্রিয় এবং কর্মক্ষম করে রাখতে পারেন, যে কোন কাজে ঝাপিয়ে পড়তে পারেন সহজেই – সাহসের সাথে। ফলে, ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক সাফল্য, সমৃদ্ধি ও উন্নতি হয় ত্বরান্বিত।

এভাবে জীবন-বীমা ব্যক্তিগত ও পরিবার জীবনের সমস্যা, দুর্দশা, অনিশ্চয়তা ও বিপদ-আপদ কাটিয়ে উঠতে তথা জীবনের প্রয়োজন মিটাতে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে থাকে। তাই, হয়ত বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছিলেন — “Life insurance is a rainbow in a cloudy sky (জীবন-বীমা হলো মেঘাচ্ছন্ন আকাশে আশার আলোক বর্তিকা)”।

Leave a Comment