জীবন বীমা একাধারে বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষার উপায় – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “জীবন বীমা” অধ্যায়ের একটি পাঠ। ১৮৬২ সালে London Assurance Corporation-এর সাবেক একচুয়ারী মি. এ. এইচ. বেইলী (A. H. Bailey)-র একটি প্রবন্ধ Journal of the Institute of Actuaries | Vol–X) -এ ছাপা হয় যেখানে তিনি জীবন বীমার পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগের ৫টি নীতির উল্লেখ করেছেন যার সমর্থনে এম. এন. মিশ্রও বলেছেন— The Conons of investment are safety. profitability, liquidity, diversification and increasing of life business (নিরাপত্তা, মুনাফাজনকতা, তরলতা, বহুধা প্রবহমানতা এবং জীবন বীমা কারবারের বিস্তার হলো বিনেয়োগের নীতিমালা”। অর্থাৎ, জীবন বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপন বীমার কারবারে এসব নীতি বা উপাদান বিদ্যমান এবং সেদিক থেকে জীবন বীমাকে বিনিয়োগের একটি অন্যতম উপায় হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।
জীবন বীমা একাধারে বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষার উপায়

(1) যেহেতু এখানে বীমা কিস্তি বা সেলামী হিসেবে প্রদত্ত অর্থের নিরাপত্তা বিধান করা হয় যথার্থ পন্থায়। কারবারের স্বার্থেই নিয়ত ও সযত্ন লক্ষ্য রাখা হয়। যাতে কোনমতেই বীমাগ্রহীতাদের অর্থ তথা কারবারের মূলধন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়
(11) কিস্তি বা সেলামী হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ অলসভাবে জমা না রেখে এমনভাবে খাটানো হয় যাতে প্রতিষ্ঠানের মূলধনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, আবার সেলামীর অর্থে প্রাপ্য ও সুদের দক্ষ আগম-নির্গমে বীমাপ্রতিষ্ঠান সর্বাধিক মুনাফাজনকতা নিশ্চিত করতে পারে।
(iii) বীমা কিস্তি হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ থেকেই মূলতঃ সৃষ্ট সঞ্চিতি তথা তহবিল এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয় যাতে বীমাদাবী পরিশোধ করা যায় সহজে ও যথাসময়ে।
(iv) বীমাকারী সংগৃহীত অর্থ এমনভাবে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষেত্রে খাটান ও কাজে লাগান যাতে যথার্থ তারল্যও (Liquidity) ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আবার অর্থাগমের সচলতা ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত থাকে এবং
(v) এভাবে জীবন বীমা কারবারের বিস্তার বা সম্প্রসারণ ও প্রবৃদ্ধি সাধিত হয়। স্থূলভাবে বলতে গেলে এভাবে বলা যায়, জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ একদিকে মানুষের জীবনের দুর্বলতম জায়গাগুলোতে দৃষ্টি টেনে নিয়ে বৈষয়িক জীবন-সচেতন করে বীমাপত্র ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে এবং তারপর বীমাপত্র বাচিয়ে রাখার মানসিক তাড়না সৃষ্টিতে বীমাগ্রহীতাকে সঞ্চয়ী করে তোলে। আর, এভাবে বীমাকারীর কাছে যে, অর্থ জমা করতে থাকেন তা সুদযুক্ত হয়ে বাড়তে থাকে।
আবার, বীমাকারী সংগৃহীত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাইরে খাটিয়ে তার উপর অধিহারে প্রাপ্য সুদ সংযোগে অর্থের ও মুনাফার পরিমাণ ক্রমাগতভাবে বাড়িয়ে তোলেন। অর্থ সংগ্রহ, সঞ্চয় ও খাটানোর মাধ্যমে তাকে বাড়িয়ে তোলার এই সুচতুর প্রক্রিয়াটিই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগ (Investment)। সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, জীবন বীমা সঞ্চয় ও বিনিয়োগের এক চমৎকার পন্থা হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ, জীবন বীমা বিনিয়োগের উপাদান সমধিক মাত্রায় বিদ্যমান থাকে।
অন্যদিকে, অন্যান্য বীমার ন্যায় জীবন বীমাও বীমাগ্রহীতার দুর্যোগ ও দুর্ভাগ্যের বিরুদ্ধে জীবন-যুদ্ধের ক্রান্তি লগ্নে প্রতিরক্ষা (Protection) বিধান করে। মানুষের জীবন পথের বাকে বাকে কত যে বিপদ-আপদ ও অনিশ্চয়তা ওৎপেতে থাকে তার ইয়ত্তা নেই। তাইতো, সে প্রতিনিয়ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় জীবন যাপন করে। মানুষের এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর দুঃখ-বেদনার উপশম দিতেই বস্তুতঃ জীবন বীমার উদ্ভব ঘটেছে।
জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান বা বীমাকারীর সাথে চুক্তির ভিত্তিতে বীমাকিস্তি বা সেলামী প্রদান করে বিপদ-আপদের বিরুদ্ধে বীমাপত্র গ্রহণ করলে, বীমাকারী বীমাকৃত বিপদ-আপদের কারণে ক্ষতি সংঘটিত হলে তা পূরণ করে দেন। এমনকি, জীবনের স্বাভাবিক প্রয়োজন অনুযায়ীও বিভিন্ন রকম বীমাপত্র ক্রয় করে জীবন পরিচালনায় সহায়তা গ্রহণ করতে পারেন। তবে, প্রতিরক্ষার বিষয়টি, ঘটনার ক্ষেত্রে নয়; বরং দুর্ঘটনার বিরুদ্ধেই বেশী প্রযোজ্য। তাই এটি সত্য যে, অন্যান্য বীমার ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষার প্রশ্নটি সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। তবে, উপরোক্ত আলোচনায় স্পষ্ট যে, জীবন বীমার ক্ষেত্রেও প্রতিরক্ষার উপাদান যথেষ্ট পরিমান বিদ্যমান।
কেননা, সম্পদ-সম্পত্তির জন্যে যেমন বিপদ-আপদ আছে— জীবনের জন্যেও তেমনি বিপদ-আপদ রয়েছে। আগেই তাই বলা হয়েছে, দুর্যোগ-দুর্ভাগ্য ও বিপদ আপদ হলে এবং তার বিরুদ্ধে বীমাকৃত থাকলে বীমাকারী বীমা দাবী পরিশোধের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বিধান করেন। সুতরাং, বলা যায়, জীবন বীমা একাধারে বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষার উপায়। অর্থাৎ জীবন বীমায় বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষার উপাদান একাধারে বিদ্যমান থাকে।

অন্যান্য বীমায় প্রতিরক্ষার উপাদান থাকে বটে, কিন্তু, বিনিয়োগের উপাদান থাকে না। কেননা, অন্যান্য বীমায় বীমাকৃত দুর্ঘটনা না ঘটলে তথা ক্ষতি সংঘটিত না হলে বীমাদাবী পরিশোধ করা হয় না। অর্থাৎ, বীমা সেলামী হিসেবে প্রদত্ত অর্থ, ক্ষতি নাহলে আর ফেরত প্রদান করা হয় না। অথচ, জীবন বীমায় শুধু কিস্তির অর্থ নয়, তার সাথে সুদ যুক্ত হয়ে বীমাদাবী হিসেবে তা প্রায় সর্বক্ষেত্রে অবশ্য পরিশোধ্য হয়। একারণেই জীবন বীমা বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক জনপ্রিয়তায় বিদ্যমান। তবে, বিভিন্ন প্রকার জীবন বীমায় প্রতিরক্ষা ও বিনিয়োগের বিদ্যমানতার মাত্রা কম-বেশী হয়ে থাকে। যেমন : মেয়াদী বীমায় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বেশী, প্রতিরক্ষা কম; পক্ষান্তরে, সাময়িক বীমায় সঞ্চয় বা বিনিয়োগ নেই বললেই চলে, কিন্তু প্রতিরক্ষার উপাদান সর্বাধিক মাত্রায় বিদ্যমান থাকে।
কেননা, সাময়িক বীমাপত্রে মেয়াদের মধ্যে মারা গেলেই কেবল বীমাদাবীর অর্থ পাওয়া যায়, কিন্তু, মেয়াদ পর্যন্ত বা তারপরেও বেঁচে থাকলে আর কোন বীমাদাবীর অর্থ পাওয়া যায় না। অবার, আজীবন বীমায় বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষার উপাদান প্রায় সমভাবে বিদ্যমান থাকে।
সে যাই হোক, কিছুটা পুনরাবৃত্তিতেই আবার বলা যায় যে, কেবলমাত্র জীবন বীমায়ই বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষার উপাদান একাধারে বিদ্যমান থাকে; কিন্তু, সম্পত্তি বীমা তথা অন্যান্য সকল বীমায় একমাত্র প্রতিরক্ষার উপাদানটিই বিদ্যমান থাকে।
