জীবন বীমাযোগ্য স্বার্থ শর্তাবলী

জীবন বীমাযোগ্য স্বার্থ শর্তাবলী – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “জীবন বীমা” অধ্যায়ের একটি পাঠ। বীমা চুক্তিতে বীমাকারী ও বীমাগ্রহীতার মধ্যে কতকগুলো লিখিত-অলিখিত শর্ত, প্রতিশ্রুতি এবং শর্তের আনুষঙ্গিকতা থাকে, যেগুলোকে শর্তাবলী নামে অভিহিত করা হয়। এই শর্তাবলীই হলো চুক্তির জন্যে একান্ত অপরিহার্য উপাদান তথা চুক্তির ভিত্তি। এই শর্তাবলী হতে পারে প্রথমতঃ দুধরনের। যথন –

(১) ব্যক্ত বা প্রকাশ্য অথবা উক্ত শর্তাবলী (Expressed warranties)

(২) অব্যক্ত বা অপ্রকাশ্য অথবা অনুক্ত শর্তাবলী ( Unexpressed or Implied warranties.)।

যেসব শর্ত লিখিতভাবে উল্লেখ থাকে, সেসব শর্তকে ব্যক্ত শর্ত বলে। আর, যে সব শর্ত লিখিত বা উক্ত থাকে না তাকে অনুক্ত বা অব্যক্ত শর্ত বলে। তবে, অনুক্ত থাকলেই তা কম গুরুত্ব বহন করে না; বরং, তা এতটা গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাখ্যা করতে হয় না এবং পালন করা না হলে চুক্তিই বাতিল হয়ে যায়।

 

জীবন বীমাযোগ্য স্বার্থ শর্তাবলী

 

জীবন বীমাযোগ্য স্বার্থ শর্তাবলী | জীবন বীমা | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

ব্যক্ত শর্তের দু’টি উপ-প্রকরণ রয়েছে। যথাঃ —

১। তথ্যদায়ক শর্তাবলী (Informative Warranties):

প্রস্তাবকারী বা সম্ভাব্য বীমাগ্রহীতা প্রস্তাবনা পত্রে জিজ্ঞাসিত বিষয়সমূহে তার জ্ঞাতসারে সকল তথ্য সত্যতা সহকারে ও সন্নিশ্বাসে বিবৃত করবেন বলেই আশা করা হয়। অন্যথায়, চুক্তি গঠিত হবে না। অর্থাৎ, প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতা প্রস্তাবনা পত্রের প্রশ্ন মোতাবেক সঠিক উত্তর দিবেন। তাই এ ধরনের শর্তাবলীকে সত্যার্পণ বা হ্যা সূচক শর্তাবলী (Affirmative wrranties) বলা হয়।

 

২। প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকারমূলক শর্তাবলী Promissory Warrantles) :

ভবিষ্যৎ কোন বিষয়ে বীমাগ্রহীতার প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার প্রত্যাশায় সন্নিবিষ্ট প্রশ্নের জবাব যদি হয় চুক্তি গঠনের একটি ভিত্তি, তাহলে তাকে বলা হয় অঙ্গীকারমূলক শর্তাবলী। যেমনঃ – প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতা ভবিষ্যতে কোন বিপদজনক পেশা গ্রহণ করবেন না এবং যদি গ্রহণ করেনও, তাহলে বীমাকারীকে জানানো হবে, এই মর্মে চুক্তি সন্নিবিষ্ট যে শর্ত তাকে প্রতিশ্রুতিমূলক শর্ত বলা হয়।

 

৩। নিকটতম বা অব্যবহিত কারণ (Proximate cause) :

ক্ষতির অব্যবহিত কারণ নীতি (Doctrine of causa proxima)-টি যদিও জীবন বীমার ক্ষেত্রে ততটা প্রযোজ্য নয়। কেননা, এখানে সাধারণতঃ বীমাদাবী পরিশোধ করতেই হয়। কিন্তু, জীবন বীমা চুক্তিতেও ব্যতিক্রমীভাবে কোন কোন ক্ষেত্রে এ নীতির প্রয়োগ রয়েছে। যেমন : –

(ক) যুদ্ধ-ঝুঁকি (War-Risk) :

বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে যুদ্ধ এবং আকাশ বিহার-এর ঝুঁকি বাদ দিয়ে বীমাপত্রটি দিয়েছিলেন। কিন্তু, দেখা গেল, বীমাগ্রহীতা যুদ্ধ ক্ষেত্রেই মারা গেলেন। এক্ষেত্রে, যৌক্তিক কারণেই বীমাকারী বীমাপত্রের পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করবেন না, করবেন শুধু সেলামী যতটা দেয়া হয়েছে অথবা সমর্পণ মূল্য যতটা অর্জিত হয়েছে – এর মধ্যে যেটি বেশী তার সমপরিমাণ অর্থ।

(খ) আত্মহত্যা (Suicide):

একথা সত্য য, নিছক শখে অথবা আনন্দে কোন মানুষ আত্মহত্যা করে না; বরং, নিদারুণ ও অসহ্য দুঃখ-কষ্টেই সাধারণতঃ মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এতদ্‌সত্ত্বেও এটি একটি গুরুতর অপরাধ বলেই বিবেচিত। এমনকি, আত্মহত্যায় ইন্ধন যোগানও সমান অপরাধ হিসেবে গণ্য। এ নৈতিক মূল্যায়নের প্রেক্ষিতেই নির্ধারিত হয়েছে যে, কোন বীমাগ্রহীতা আত্মহত্যা করলে বীমাকৃত অর্থ প্রদান করা উচিৎ নয়। কেননা, তাতে এ প্রবণতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে পারে। তবে, কোন প্রকার রোগের প্রকোপে দিশেহারা হয়ে আত্মহত্যা করলে এ নিয়ম প্রযোজ্য হয় না।

এ বিষয়ে সাধারণ বিধান হল এই যে, বীমাকৃত মেয়াদের আরম্ভ বা বীমাকারী কর্তৃক ঝুঁকি গ্রহণের সময় থেকে এক বছরের মধ্যে যদি কোন বীমাগ্রহীতা আত্মহত্যা করেন,তাহলে তার মনোনীত ব্যক্তি বীমাদারী আদায় করতে পারেন না। কোন কোন কোম্পানী অবশ্য বীমাগ্রহীতা দুবছরের মধ্যেও আত্মহত্যা করলে বীমাদারী প্রদানের দায় গ্রহণ করে না। তবে, উক্ত সময়ের পরে যে কোন সময়ে কোন বীমাগ্রহীতা আত্মহত্যা করলে, তার মনোনীত ব্যক্তিকে বীমাদাবী পরিশোধ করা হয়।

উপরোক্ত সাধারণ বিধানের একটি ব্যক্তিক্রম হলো এই যে, বীমাচুক্তি গঠণ তথা ঝুঁকি গ্রহণের কাল থেকে এক বছরের মধ্যে যদি কোন বীমাগ্রহীতা বা বীমাকৃত ব্যক্তি আত্মহত্যা করেন অথবা তার আত্মহত্যা করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে এবং সেমর্মে উক্ত বীমাপত্রে স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তৃতীয় কোন পক্ষ আত্মহত্যার অন্ততঃ ১ মাস আগে তার স্বার্থ সম্পর্কে বীমাকারী অবহিত করে থাকলে স্বার্থের অস্তিত্ব প্রমান সাপেক্ষে কেবলমাত্র তার স্বার্থ-সীমা পর্যন্ত বীমাদাবীর অর্থ আদায় করতে পারেন।

 

(গ) দুর্ঘটনা ভাতা (Accident Benefit) :

দুর্ঘটনা ভাতা জীবনবীমা চুক্তির একটি অন্যতম উপাদান। কেননা, বীমাগ্রহীতা দুর্ঘনার কারণে মারা গেলে বা আঘাত প্রাপ্ত হলে দুর্ঘটনা ভাতা প্রদান করা হয়। তবে, সমস্যা হয় তখন, যখন বীমাগ্রহীতা দুর্ঘটনা বীমার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হয়ে মারা যান বা আঘাত প্রাপ্ত হন এবং ক্ষতির নিকটতম ও দূরবর্তী দু’টো কারণ বিদ্যমান থাকে। এক্ষেত্রে, মৃত্যুর কারণই হচ্ছে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ।

 

জীবন বীমাযোগ্য স্বার্থ শর্তাবলী | জীবন বীমা | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

৫। মনোনয়ন ও অধিকার অর্পণ (Nomination and Assignment) :

জীবন বীমার ক্ষেত্রে মনোনয়ন একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। কেননা, বীমাগ্রহীতা তার মৃত্যুতে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে বীমাদাবীর অর্থ গ্রহণের জন্যে নির্বাচন করেন বা তার নামোল্লেখ করে দেন যা মনোনয়ন নামে অভিহিত। পক্ষান্তরে, যদি কোন কারণে, প্রথম বা মূল বীমাগ্রহীতা অন্য কাউকে বীমাপত্রটি হস্তান্তর তথা পত্রের অধিকার হস্তান্তর করেন • তাকেই অধিকার অর্পণ বলে। এই 1 অধিকার বা স্বার্থ হস্তান্তর জীবন বীমার ক্ষেত্রেই প্রধানতঃ এবং কখনও নৌ-বীমার ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং, জীবন বীমা চুক্তিতে মনোনয়ন ও অধিকার অর্পণ অপরিহার্য বিষয় বটে।

 

৬। কিত্তি ফেরত (Return of Premium) :

সাধারণতঃ বীমাগ্রহীতা কর্তৃক প্রদত্ত কিস্তির অর্থ ফেরতযোগ্য নয়। তবে, কোন কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে ফেরত দেয়া হয়। যেমনঃ – পারস্পরিক চুক্তি অনুযায়ী, সুবিচার অথবা দ্বিগুণ বীমা করলে বীমা কিস্তি খাতে প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থ কখনও ফেরত প্রদান করা হয়। তাই, কিত্তি ফেরতের বিষয়টিও বামাচুক্তিতে একটি প্রয়োজনীয় শর্ত তথা উপাদান। এগুলোই মূলতঃ জীবন বীমা চুক্তির অপরিহার্য উপাদান বা উপকরণ।

Leave a Comment